আসল সান্তাক্লজ



ছেঁড়া চাদরটা কাঁধ থেকে নামিয়ে মাটিতে পেতে তার ওপর ক্লান্ত শরীরটাকে ছুঁড়ে দিল আব্দুল। এই শীতে খুব বেশী আরাম যদিও দিতে পারে না, তবু এই চাদরটা তার বড় প্রিয়। শতচ্ছিন্ন। তবু ফেলতে ইচ্ছে করে না। আর একটা চাদর হয়তো ইচ্ছে করলে কিনতেই পারে সে। কিন্তু বড় মায়া পড়ে গেছে এই চাদরটার ওপর। ইছামতি গায়ে দিত এটা। তারই হাতে বোনা নামটা আজও রয়েছে চাদরটার কোণে। তার স্মৃতির আর তো কিছু নেই। ইছামতির চিকিৎসা করাতে গিয়েই সব বেচে দিতে হয়েছে। তবু বাঁচাতে পারেনি তাকে। ওর ইচ্ছাকে। তাই এই চাদরটা থাক্‌।

না। আজ ইচ্ছার কথা কেন যে মনে পড়ছে বারবার। এমন কিন্তু হবার কথাই ছিল না! সকালবেলা কত খুশীতে ঘুম ভেঙেছিল আজ। না, আজ আর রোজকার মতন অত ভোর থাকতে উঠতে হয়নি। প্রথম ট্রেন আসার আগে থেকে গিয়ে এই চাদর বিছিয়ে বসতে হয়নি প্ল্যাটফর্মে। আজ তেমন দিনই নয়।

আব্দুল আর ভারী কাজ কিছু করতে পারে না। বয়স তো কম হলো না! চার কুড়ি হবে কি? হতে পারে। হিসাব নেই। কিন্তু কাজ না করলে খাওয়াবে কে! তাই রোজ সকালে ওই চাদর পেতে বসতে হয় প্ল্যাটফর্মে। পুলিশ বাবুরা প্রথম দিকে তুলে দিত। কিন্তু টাকা তো চেনে সবাই। সে কম হোক্‌ কি বেশী, ছোটোলোক হোক্‌ কি বড়ো বাবুরা। রোজকার হিস্যায় পোসালো, তবেই না! ব্যবসায় এক দর। কিন্তু ভিক্ষার সুবিধা এটাই যে যত পেলে তার ওপর নির্ভর করে কত দিতে হবে তোমাকে। নয়ত কি আর না খেয়ে থাকবে নাকি মানুষ?

বেমক্কা খাবার কথাটা মাথায় এলো কেন এই অসময়ে?

মাথাটা গরম হয়ে যায় আব্দুলের। আজই জুটলো না কিছু খেতে। তবু, আজই কিন্তু সত্যিকারের আনন্দের দিন ছিল।

তখন কত বয়েস হবে আব্দুলের? পাঁচ কি ছয়। প্রথম কেক খেয়েছিল সে।

"এই দারুণ খেতে জিনিসটা কি আব্বাজান?" আব্বুকে জিজ্ঞেস করেছিল সে। এখন সেসব ছোটোবেলার কথাই যেন সবচেয়ে পরিষ্কার মনে পড়ে!

"কেক, বেটা। খা। আজকে খা। আজ তো বড়োদিন।"

"ওই বুড়োটা কে আব্বু?"

"কোন্‌ বুড়োটা, সোনা?"

"ওই যে, যে এই জিনিসটা দিয়ে গেল? ওই লাল জোব্বা পরা, দাড়িওয়ালা বুড়োটা?"

"ওহ্‌ ওটা?" হেসে উঠেছিল আব্বু, "ওটা বুড়ো না বেটা। জোওয়ান অমন সেজেছে। ও সান্তাক্লজ।"

"সান্তাক্লজ কি আব্বু?"

"আমাদের যেমন আল্লাতালা, কেরেস্টানদের যিশুর সাথেই আছে সান্তাক্লজ। সব ভালো বাচ্চাদের ভালো ভালো খাবার, উপহার দেয় সান্তাক্লজ।"

"ধুর! তবে তুমি যে বললে লোকটা সেজেছে সান্তা। আল্লাতালা সাজা যায় নাকি?"

"যায় বাবা, যায়। অনেক পয়সা থাকলে সান্তা, আল্লাতালা, সব সাজা যায়।" আব্বুর কথাগুলো এখনও কি করে এমন স্পষ্ট মনে আছে!

এর পর থেকে প্রতি বড়দিনে সে শুধু সান্তার পথ চেয়েই থেকেছে। পেয়েছে। কিন্তু না, সব সময়ে নয়। যত বয়েস হয়েছে, তত বুঝেছে, আব্বু পুরোটা সত্যি কথা বলেনি। আল্লাতালার মতোই, সান্তাক্লজ সকলের জন্য আসে না। তুমি গরীব? ফুটপাথে শুতে হয়? না, তোমার জন্য সান্তাক্লজের ঝুলিতে কিস্যু থাকবে না। কিন্তু আলোর রোশনাইয়ে সাজানো দোকানগুলোতে যদি ঢুকতে পারো, যেদিকে আব্দুল, রোশনীরা শুধু তাকিয়েই থেকেছে ছোটো থেকে, তাহলে কিন্তু ওই ঝুলি থেকে তুমি কিছু না কিছু পাবেই। হ্যাঁ, মাঝে মধ্যে মনে করলে অবশ্য সান্তাক্লজ ওখান থেকেই হয়তো একটা কেক ছূঁড়ে দেবে তোমার দিকে, রাস্তার কুকুরকে যেমন দেয় বড়ো মানুষেরা।

আব্দুল কিন্তু তখন থেকেই ভেবেছিল, তার সন্তানকে যেন সান্তাক্লজ কখনো অবহেলা করতে না পারে।

হ্যাঁ, মজাও পেত আরিফ। বড়দিনের সকালে উঠেই তুলে দেখত বালিশের তলা। কখনো কেক, কখনো সামান্য লজেন্স। তাতেই সে খুশী। তাও তো দিতে পারলো না তাকে বেশীদিন। কোন্‌ এক অজানা জ্বরে সেও ছেড়ে চলে গেছিল তার আব্বু আর আম্মিকে। কতদিন হয়ে গেল! আজও যখন ইছামতিকে দেখতে যায়, তার পাশে ওই ছোট্ট, আরও বহু পুরোনো কবরটাতেও একটু ফুল ছড়িয়ে আসে আব্দুল।

ওফ্‌! খালি পেটের এই এক দোষ। এসব কথা মনে আসতে নেই! আনে না সে কখনো। এসব কথা এলেই সাথে চোখের কোণে জলটাও চলে আসে।

কিন্তু আরিফ চলে যাবার পর থেকেই প্রতি বড়োদিনেই মনে পড়তো তার কথা। কি করে ভুলবে ওর কথা সে?

না, ভোলা যায় না। কিন্তু অন্য আরিফরাও তো আছে। আরও অনেক আরিফ। তাদের জন্য কি কিছুই করবে না সে?

প্রতি বছর বড়দিনে তাই নিজেই সান্তাক্লজ সেজে বেড়িয়ে পড়ত আব্দুল। তারই জমানো টাকায় কিনে ফেলত কিছু সামান্য উপহার।

"আমাদের আরিফ তো আর ফিরবে না, আব্দুল। কাকে খোঁজো তুমি এই সান্তাক্লজ সেজে?" জিজ্ঞেস করতো ইচ্ছা।

সত্যিই জানে না আব্দুল। তবু বলত, "আমাদের আরিফের মতো আরো কতো আরিফ আছে, ইচ্ছা। রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি আর দেখি। ওরা একদিন ভালো থাকুক অন্তত।"

ইচ্ছা বাধা দেয়নি কখনো। আব্দুল বুঝত, তাদের দিন আনতে দিন ফুরানো সংসারে, এ জিনিস চলে না।

বয়েস হলো, চাকরিটা আর রইল না। এ অভ্যাস গেল না সর্বস্ব হারানোর পরেও। বেড়িয়ে পড়তো ইচ্ছার দেওয়া চাদরটাকেই সান্তাক্লজের ঝোলা বানিয়ে। খেলনা কিছু থাকত। সঙ্গে থাকত লজেন্স, চকোলেট। আর হ্যাঁ, কেক থাকত অবশ্যই। ফিরে আসত এক বুক আনন্দ নিয়ে। ওদের মতই আজকের দিনটা নিজেও খেত কেক, চকোলেট।

কিন্তু আজ কি যে হয়ে গেল!

আজও বেড়িয়েছিল তেমনই। তেমন করেই আজও খুঁজে গেছে অনেক আরিফকে। আজ কি সে পেয়েও গেল আরিফকে!

হুবহু তো আরিফ! খিদে পেটে সেই এক দৃষ্টি! কেক হাতে সেই এক হাসি!

"এও কি সম্ভব!" ভেবেছে আব্দুল।

সব, সব কিছু তাকে দিয়ে দিয়েছে সে। কিচ্ছু রাখেনি তার নিজের জন্য। তাতে কোনো দুঃখ নেই আব্দুলের। কিন্তু তারপর - সব ওকে দিয়ে আসার পর চলে আসতে আসতে যেই ফিরে তাকালো আব্দুল। কোথাও...কোথাও নেই তার আরিফ! তবে কি সে ভুল দেখল!

কেন? কেন এমন হয়!

আর কোনোদিন, আর কোনোদিন সে যাবে না সান্তা হতে। আর কোনোদিন না। ঠিকই বলতো ইচ্ছা। আর তাহলে কি আছে তার? কোনো দায় নেই, কিচ্ছু করার নেই। কাল থেকে অখন্ড অবসর!

কিন্তু আরিফরা? আজকের আরিফের হাসি কি সে ভুলতে পারবে?

না। কাল থেকে আবার পথেই বেরোবে আব্দুল। না, কাজ করার বয়েস আর নেই তার। তবু গিয়ে বসবে স্টেশনের ওই কোণ্‌টায়। যা পায় সারা বছর তাই দিয়েই আবার বেরোবে পরের বড়দিনে। কাঁধে ঝোলা। আসল সান্তাক্লজ। শুধু আরিফদের জন্য।


©দীপাঞ্জন মুখার্জি

-সমাপ্ত-

মন্তব্যসমূহ