পথিকৃৎ



মানুষ দেখতে আজকাল আর ভালো লাগে না কৃশানুর।

এমনিতে কলকাতা শহরে অধিকাংশ লোককে মানুষ দেখার কথা জিজ্ঞেস করলে তারা অবাকই হয়।

"মানুষ! সে আবার দেখার কি আছে!"

এমন ভাবে তাকিয়ে থাকে যেন এমন অদ্ভুত কথা এই প্রথম শুনছে।

কেন এমন হয়?

সেই ছোটো থেকেই অনেকবার ভেবে দেখেছে কৃশানু। কেউ কেউ যেন বুঝতে পারে না কি অপার্থিব সৌন্দর্য্য তাদের সামনে রয়েছে। তারপর বুঝেছে, এতে সকলকে দোষ দেওয়া চলে না। একে তো এই ইঁট, কাঠ, পিচ, কংক্রিটের জঙ্গলে, জীবনের ইঁদুর লড়াইয়ে সামান্য অবকাশটুকুও হারিয়েই যাচ্ছে ক্রমাগত।

কিন্তু সে নিজেও কি জীবনযুদ্ধে সামিল হয়নি? সে তবে কি করে তাকে এমনভাবে টানে এইসব?

অনেকদিন আগেই অবশ্য এর উত্তর পেয়ে গেছে কৃশানু। এই পৃথিবীর নানান রঙ, নানান আকৃতি, এবং সবচেয়ে বেশী, নানান রকমের মানুষ তাকে এমন ভাবে টানে যেরকম করে আর কিছু টানে না। আর তাদেরকে দেখার চোখটাও যেন তার অন্যদের থেকে আলাদা।

এর ফলও পেয়েছে কৃশানু। সেই স্কুল জীবন থেকেই আঁকার খাতা হাতে পেলে সেটিকে জীবন্ত করে তুলতে পারে কৃশানু। ছোটো থেকেই আঁকার নেশা পেলে আর কিছুই জানত না সে। যে মানুষকে ইচ্ছে এঁকে ফেলতে পারত। তার পোট্রেট আঁকার হাতটা দেবদত্তই বলতে হবে। আর সে ভাগ্যবানও বটে। স্কুলেই পেয়েছিল হিমাদ্রি বাবুর মতন আঁকার শিক্ষককে। সেই ছোট্ট বয়সেই, আর কেউ যখন বুঝতে পারেনি তার প্রতিভা, হিমাদ্রি বাবু পেরেছিলেন। সেই সময়ে ওর পিছনেই মনপ্রাণ ঢেলে দিয়ে শিখিয়েছিলেন তিনি। আর সেই জন্যই আঁকাকেই পেশা হিসাবে নিতে পেরেছে কৃশানু। এখনও পাঁচ বছরও হয়নি পেশাদারি আঁকার জগতে প্রবেশ করেছে সে, তবু আজকাল কলকাতায় সেরা পোট্রেট আঁকিয়েদের নাম যখন করেন সমজদাররা, সামনের দিকেই আসে কৃশানু ভট্টাচার্য্যর নাম।

"এই যে তোমার এত ছবি দেশ বিদেশের খরিদ্দাররা কেনেন, আমার একটা ছবি এঁকে তো আমাকে উপহার দিলেও পারো", মালিনী বলতো তাকে।

কৃশানু অবশ্য জানতো যে নেহাৎই মজা করছে মালিনী। পেনসিল, রঙ, তুলির সঙ্গে কোনোদিনই সখ্যতা নেই তার প্রেমিকার। তবু মালিনী সব সময়েই তাকে উৎসাহ জুগিয়ে গেছে। কৃশানু নতুন কোনো ছবি শেষ করলে তার প্রথম দর্শক আজও মালিনীই।

"কি গো, নতুন কোনো ছবি আঁকছো না?" কালও জিজ্ঞাসা করেছিল মালিনী। প্রায়ই যেমন করে থাকে।

কি উত্তর দেবে কৃশানু! তবু বলেছিল। কারণ তার সমস্যার কথা মালিনী ছাড়া আর কাকে বলবে! আর কে বুঝবে!

"আমি আর আঁকতে পারছি না, মালিনী!"

"সে কি! কেন?"

"আমি জানি না। আর পারছি না। কোনো স্ট্রাকচার আসছে না।"

"সে কি! তা আবার হয় নাকি?"

"মালিনী আমি পারছি না। গত এক মাস আমি নতুন কোনো ছবি শুরু করতে পারিনি।"

"তুমি শুধু রঙ দিয়ে চেষ্টা করে দেখো।" চিত্রশিল্প সম্বন্ধে তার অগভীর জ্ঞানে যেটুকু বোঝে তাই দিয়েই সাহায্য করতে চাইল মালিনী।

কৃশানু জানে চিত্রশিল্প নিয়ে মালিনীর কোনো ঐতিহ্যগত পড়াশোনা নেই। সে যা জানে, কৃশানুর মুখ থেকে শুনে শুনেই জানে। তাই তাকে এই কথা বোঝানো বৃথা একটা ছবি আঁকার জন্য ঠিক কতটা মানসিক প্রস্তুতি দরকার। তবু কৃশানু একটা শেষ চেষ্টা করে দেখেছিল।

"তুমি আমাকে সাহায্য করতে পারবে মালিনী? আমাকে একটা সাবজেক্ট বলো। একটা বিষয় যার ওপর আমি ছবি আঁকতে পারবো।"

"তোমার ছবির আমি কি বুঝি, বলো! আমি কি করে বলবো! আমাকে নিয়ে আঁকবে? সে তো এঁকেছো আগেই," অবাক হয়েছে মালিনী।

কৃশানু জানতো এর কোনো উত্তর নেই। তার নিজের কাছেই নেই!

ঠিক কিভাবে হলো এটা! নিজের মধ্যেই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে কৃশানু।

ক'দিন আগেই একটা ছবি শেষ করে কৃশানু প্রথম অনুভব করেছিল সে ক্লান্ত। ছবি এঁকে এর আগে কখনো এমন বোধ হয়নি। আসলে এই ছবিটা আঁকার সময়েই একটা স্বপ্ন দেখে কৃশানু।

আজ কত তারিখ? ৩রা নভেম্বর? তাহলে আজ থেকে ঠিক এক মাস আগে! ৩রা অক্টোবর। বিকেলের দিকে ক্লান্ত হয়ে কাউচেই ঘুমিয়ে নিচ্ছিল সে। তখনই দেখল - দেখেছিল কি কিছু? নাকি শুধুই শুনেছিল!

"কেমন আছো, আয়দিন?" বহুদূর থেকে যেন এক বৃদ্ধের ক্লান্ত কন্ঠস্বর।

চমকে উঠেছিল কৃশানু। এই নামে তো আর কেউ কখনো ডাকেনি তাকে!

"হিমাদ্রি বাবু?"

কেউ কোনো উত্তর দিল না। কাউকে দেখতে পাচ্ছে না কৃশানু।

"হিমাদ্রি বাবু?" আবার জিজ্ঞেস করেছিল কৃশানু।

"তুমি মহম্মদিকে ভুলে গেছ, আয়দিন! মহম্মদি কিন্তু আয়দিনকে ভোলেনি।"

কৃশানুর ঘুম ভেঙে যায়। আর কিছু নয়।

হাবিব মহম্মদি! ওহ! সত্যি ভুলে গেছে কৃশানু।

সেই স্কুল জীবনেই তার হাতের আঁকা দেখে হিমাদ্রি বাবুই  ইরানের চিত্রশিল্পী আয়দিন আঘদাসলুর কথা বলেছিলেন কৃশানুকে। কি ধরনের ছবি আঁকেন আয়দিন, কি রকম রঙের পোচ মারেন, কোন্‌ কোন্‌ শেডস্‌ ব্যবহার করেন - সব। হিমাদ্রি বাবু কৃশানুকে ডাকতেন আয়দিন বলে। "তুমি হলে আমার আয়দিন, আর আমি তোমার হাবিব মহম্মদি।" আয়দিন আঘদাসলুর জীবনের প্রথম ছবি আঁকার শিক্ষক। প্রথম পথটা যে দেখিয়ে দিয়েছিল, কিন্তু যাঁকে কেউ চিনত না। কেবলমাত্র ছাত্রদের হাত ধরে পৃথিবী চিনেছে যাঁকে। সত্যিই হাতে ধরে সঠিক পথটা দেখিয়ে দিতেন হিমাদ্রি বাবু।

কিন্তু একটি বিষয়ে হিমাদ্রিবাবুকে খুশী করতে পারেনি সে। কৃশানুর প্রথম থেকেই পোট্রেটের প্রতি ঝোঁক। হিমাদ্রি বাবু বলতেন, "কি হবে এই দেখে দেখে পোট্রেট এঁকে? ও তো সবাই দেখছে। তুমি শুধুই  আলাদা কি দেখছো তা-ই আঁকো। তোমার স্টাইলটা অনেকটা আয়দিন আঘদাসলুর মতো! একই রকম তুলির টান। তুমি পোস্টমডার্নে যাও। দেখবে কত মজা পাবে।"

কিন্তু পোট্রেট কৃশানুকে টানত। আঁকার খাতার পাতায় মানুষকে জীবন্ত করে তোলার আলাদা মজা। তাই পোট্রেটই ছিল তার পথ। তাই সাফল্যও পেয়েছে মোটামোটি।

শেষ যেবার গ্রামে গেল কৃশানু, প্রবীরের বাড়িতে, হিমাদ্রি বাবুর সঙ্গে হঠাৎই দেখা হয়ে গিয়েছিল। বৃদ্ধ তখনও মনে রেখেছেন কৃশানুকে। আবারও বলেছিলেন, "তুমি একই ভুল করে চলেছ, আয়দিন। পোট্রেট তোমার জন্য নয়। অনেক বড়ো কিছু অপেক্ষা করে আছে তোমার জন্য।"
হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল কৃশানু। দেবে না-ই বা কেন? ততদিনে দক্ষ পোট্রেট আঁকিয়ে হিসাবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে গোটা দেশে। দারুণ দারুণ শাঁসালো মক্কেল তার। আরামের জীবন যাপন করছে কৃশানু। সে জন্য সে অবশ্যই হিমাদ্রি বাবুর কাছে কৃতজ্ঞ। কিন্তু তাই বলে পোস্টমডার্ন! কে ঝাঁপ দেয় অজানাতে!

কিন্তু এই স্বপ্ন দেখার পর থেকে সব কিছু যে বদলে যাচ্ছে। যে পোট্রেটই আঁকতে যাচ্ছে কৃশানু, সব যেন হয়ে যাচ্ছে এক চিরপরিচিত সদাহাস্যময় বৃদ্ধের মুখ। আর কারো মুখ আঁকতে পারছে না সে। এবং তার সঙ্গে কি অদ্ভুত নকশা! নিজেকে বারবার বলছে কৃশানু, "পোস্টমডার্ন ছবি নয়। কৃশানু ভট্টাচার্য্য পোট্রেট এঁকেই নাম করেছে!"

কেন এমন হচ্ছে!

হিমাদ্রিবাবুর সঙ্গে একবার কথা বলবে কি? কিন্তু ওনার নাম্বার তো নেই। আজ মনে হলো, কোনোদিন ফোন করে খোঁজটুকুও নেওয়া হয়নি তার প্রিয় গুরুর। কি ভাবে ভুলে গেল সে হিমাদ্রিবাবুকে! নিজের ওপর রাগ হলো কৃশানুর।

কিন্তু ঠিক এক মাস হয়ে গেল সে কাজ করতে পারছে না। একটা ছবিও আঁকতে পারছে না। সে পেশাদার আঁকিয়ে। এমনটা তো ক্রমাগত চলতে পারে না!

কি করা যায়! প্রবীরকে ফোন করা যায়? ও তো এখনো গ্রামের বাড়িতে যায় প্রতি সপ্তাহান্তে।

"হ্যালো, প্রবীর।"

"হ্যাঁ কৃশানু, বল্‌। কি খবর?"

"একটা সাহায্য চাই ভায়া। আমাকে হিমাদ্রি বাবুর নাম্বারটা একটু দিবি?"

"হিমাদ্রি বাবু?"

"হ্যাঁ! আমাদের স্কুলের আর্ট টিচার হিমাদ্রি বাবু। আছে তোর কাছে ওনার নাম্বার? বা একটু কথা বলিয়ে দিবি?"

"তুই এতদিন পরে জিজ্ঞেস করলি তাহলে?"

"কেন?"

"আজ কত তারিখ? ৩রা নভেম্বর? আজ ঠিক এক মাস হলো!"

"কি?"

"গত ৩রা অক্টোবর মারা গেছেন হিমাদ্রিবাবু। তোর কথা সব সময় বলতেন উনি। তোর খবরও রাখতেন। তোকে তো কেন জানি আয়দিন না কি বলে ডাকতেন। বলতেন আয়দিনটা একদম ভুল দিকেই চলেছে। আমাকেই বোধহয় পথ দেখিয়ে দিতে হবে আবার! শেষ জীবনটা খুব ভালো কাটেনি, বুঝলি...।"

শুধুমাত্র তারিখটা ছাড়া আর কিছু মাথায় ঢুকছে না কৃশানুর! হিমাদ্রিবাবুই কি তাহলে পিছু ছাড়লেন না!

আর কিছু ভাবে না কৃশানু। ফাঁকা ক্যানভাসটার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। তুলিটা হাতে তুলে নেয়।

আয়দিনকে শুরুর পথটা হাবিব মহম্মদি দেখাবেনই!

©দীপাঞ্জন মুখার্জি

-সমাপ্ত-

মন্তব্যসমূহ