যাবার সময়



কি যে করবে কিছু বুঝতে পারে না কৌশিক। কালই কত করে বোঝানোর চেষ্টা করলো পামেলাকে। কোনো লাভই হলো না। আজও যেই কে সেই। আজও পামেলার অফিস থেকে আসতে দেরী হচ্ছিল বলে বেশ টেনশন হচ্ছিল। যখন দেখল সাড়ে দশটা পেরিয়ে গেছে, ঘরের ভিতর পায়চারি করা বন্ধ করে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে বেড়িয়ে এলো কৌশিক। তার খানিকক্ষণ পরেই রাস্তার মোড়ে গাড়ির আলোটা দেখা গেল। তারপরেই বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ালো সাদা রঙের অল্টো গাড়িটা। গাড়ির চালকের জায়গায় যথারীতি অনিমেষ। গাড়ির বাঁদিকের সামনের দরজা খুলে নেমে এলো পামেলা। তারপরও কয়েক মিনিট দাঁড়িয়ে, তারপর অনিমেষকে বিদায় জানিয়ে ঢুকল বাড়িতে।

"এতক্ষণে সময় হলো বাড়ি ফেরার? কটা বাজে খেয়াল আছে?" জিজ্ঞেস করলো কৌশিক।

পামেলা কোনো উত্তর দিল না। জুতোটা ছেড়ে সোজা বেডরুমে চলে গেল। তারপর তার নৈশপোষাক নিয়ে বাথরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। চুপ করে বেডরুমেই দাঁড়িয়ে রইল কৌশিক। পামেলা বাথরুম থেকে বেড়িয়েও তার দিকে একবারও না তাকিয়ে সোজা বিছানায় গা এলিয়ে দিল।

"কি ব্যাপার? খাবে না আজ?" জিজ্ঞেস করলো কৌশিক; "আজও বাইরে থেকে খেয়ে এসেছো নাকি?"

পামেলার এই একটা ব্যাপার একদম সহ্য হয় না কৌশিকের। ঝগড়া, মনোমালিন্য হতেই পারে। তুমি বলো তোমার কি চাই! কেন তুমি অসন্তুষ্ট হয়েছ! কিন্তু ইদানিং পামেলা কিছু বলবারও প্রয়োজন বোধ করে না!

এমন একটা ভাব করে যেন কৌশিকের কোনো অস্তিত্বই নেই! কৌশিকের কোনো প্রশ্নের জবাব দেবার প্রয়োজন মনে করে না। তার কোনো কথা শোনে বলেও তো মনে হয় না। কৌশিক অনেকবার বলার চেষ্টা করেছে, মিনতি করেছে, "কেন তুমি এরকম করছ, পামেলা? কি হয়েছে বলো আমাকে!" কোনো লাভ হয়নি। পামেলা এমন হাবভাব করেছে, যেন সে চেনেই না কৌশিককে। যেন সে বুঝতেই পারছে না ঘরে আর একজন মানুষ আছে।

অথচ এই পামেলাই কত অন্যরকম ছিল! কৌশিকের এখনও মনে পড়ে ওর সঙ্গে আলাপের প্রথম দিনটা। অর্চিতার সূত্রে আলাপ হয়েছিল দুজনের। কলেজের শেষ দিন কৌশিক, অরিজিৎ আর সৌমিলি অর্চিতার বাড়িতে গিয়েছিল। সেখানেই এসেছিল পামেলা।

কত বছর! তবু এখনও তার কেমন পরিষ্কার মনে আছে সব কিছু। একটা কালো রঙের শাড়ি পড়ে এসেছিল পামেলা। চোখে কালো কাজল। চুলটা খোলা। দেখেই কৌশিকের কেমন যেন একটা ঘোর লেগেছিল। তবু সেদিন প্রায় কোনোই কথা হয়নি তার পামেলার সঙ্গে। শুধু আলাপ। আর মোবাইল নাম্বার বিনিময়।

কৌশিক ঠিক করেছিল নিজে থেকে সে ফোন করবেই না। কিছুতেই না। প্রায় এক সপ্তাহ অপেক্ষা করেছিল পামেলার ফোনের। তারপর আর না পেরে নিজেই ফোন করে ফেলল। পরে অবশ্য পামেলার কাছে শুনেছিল, সেও নিজেকে অনেক কষ্টে আটকে রেখেছিল আর কৌশিকের ফোনের অপেক্ষা করছিল। ভাগ্যিস কৌশিক ফোনটা করেছিল। নয়তো সেদিন বিকেলেই হয়তো ফোন করে ফেলত সে।

তারপর আর কি! যাকে বলে একদম ঝোড়ো রোম্যান্স! তখন কতই বা পয়সা থাকত কৌশিকের পকেটে! টিউশানির মাইনে থেকে যেটুকু। পামেলার ব্যাগ তো আরোই ফাঁকা। তবু কখনো ছোটো কোনো রেস্তরাতে, কখনো পথে হাঁটতে হাঁটতে, আবার কখনো লেকের ধারে। আর সেভাবেই কেটে গেল সময়। ক্রমে কৌশিক একটা ইঞ্জেনিয়ারিং ফার্মে ভালো চাকরি পেল। তারপরই বিয়ে।

বিয়ের পরেও কিন্তু কখনো কৌশিকের মনে হয়নি কোথাও কোনো খাদ আছে পামেলার ভালোবাসায়। এমনকি সব সময় কৌশিকের খেয়াল রাখা - এটা যেন অভ্যাসে পরিণত করেছিল পামেলা। বিয়ের পর তিন বছর যে কি অনবদ্য আনন্দে কেটেছে, ভাবলেও অবাক লাগে। কিন্তু তারপর ঠিক কি হলো, বুঝতে পারে না কৌশিক। গত বছর দেড়েক যেন কি এক অবিশ্বাস্য বদল হয়েছে পামেলার মধ্যে। সে কৌশিককে চেনে না। কোনো কথার কোনো উত্তর দেয় না।

কিন্তু তবু এই পর্যন্ত ঠিক ছিল। কিন্তু গত ক'দিন ধরে যত দেখছে সে পামেলাকে, ততই যেন বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে।

কি আছে ওই অনিমেষের মধ্যে! সেদিন ওকে ঘরের মধ্যে এনেছিল পামেলা। ভালো লাগেনি কৌশিকের। পামেলাকে সরাসরি বলেছিল সে।

"ওকে ঘরের মধ্যে নিয়ে এলে কেন? ওই অনিমেষকে?"

কোনো উত্তর দেয়নি পামেলা। কিন্তু ওই নৈঃশব্দেই যেন বলে দিয়েছে কৌশিককে, "তোমাকে উত্তর দিতে আমি বাধ্য নই।"

না, পামেলা বাধ্য নয়। কিন্তু সে যা করছে তা কি ঠিক!

একটু আগেই হঠাৎ করেই কৌশিকের সঙ্গে আবার কথা বলল পামেলা। হ্যাঁ, অনেকদিন পরেই বোধহয়। কিন্তু যা বলল, তার জন্য কোনো ভাবেই প্রস্তুত ছিল না কৌশিক।

কাল ছিল রবিবার। বিকেলের দিকে কৌশিক হঠাৎ শুনল পামেলা বলছে, "কৌশিক!"

অনেকদিন পরে পামেলার মুখে নিজের নামটা শুনেও কেমন যেন নেশার মত লাগল কৌশিকের। তারপর পামেলা যে কি বলল তা সে জানেও না বোধহয়! হঠাৎ করে সে শুনল পামেলা বলছে, "আমি অনিমেষকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, কৌশিক। আশা করি তোমার কোনো আপত্তি নেই।"

"মানে?" চেঁচিয়ে উঠেছিল কৌশিক। "কি বলতে চাইছ তুমি? আমার! আমার কি হবে, পামেলা? আমার কথা তুমি একবারও ভাববে না!"

আবারও নিরুত্তর থেকেছে পামেলা। কৌশিক বুঝতে পারে না সে কি করবে!

ঠিক এই সময়ে বেজে ওঠে পামেলার ফোনের রিংটোন। চিরদিনের ভালো লাগার, মন খারাপের গান - "রোদনভরা এ বসন্ত সখী কখনো আসেনি বুঝি আগে..."।

বিরক্ত হয় কৌশিক। দিব্য তো আছে পামেলা। রাত করে বাড়ি ফিরছে - বোধহয় পার্টি করে। অনিমেষ বাড়িতে দিয়ে যাচ্ছে। অনিমেষকে বিয়ে করার সিদ্ধান্তও নাকি নিয়ে নিয়েছে! কৌশিকের সঙ্গে কিছু আলোচনারও প্রয়োজন মনে করল না! দিব্যি তো আছে পামেলা। এর মধ্যে এই গানটা একেবারেই বেমানান। মাথা গরম হয়ে যায় কৌশিকের। ভাবে এখনই দু'কথা শুনিয়ে দেবে পামেলাকে। কিন্তু ততক্ষণে ফোন ধরে ফেলেছে পামেলা।

"হ্যালো, বিদিশা? বল্‌।"

...

"হ্যাঁ রে, ঠিকই শুনেছিস।"

...

"হ্যাঁ, ওই সময়টা খুবই পাশে ছিল অনিমেষ।"

...

"না রে। কৌশিক ছেড়ে  চলে যাবার পর বহুদিন কিছু ভাবতে পারিনি!"

চমকে ওঠে কৌশিক। সে চলে যাবার পর মানে! সে কখনো ছেড়ে যায়নি পামেলাকে। সে ভাবতে পারে না পামেলাকে ছেড়ে যাবার কথা! এই মিথ্যে কথাটা বলতে পারল পামেলা বিদিশাকে! আরও কাকে কাকে বলেছে কে জানে! পামেলার আর কোনো কথা কানে যায় না কৌশিকের।

পামেলা ফোনটা ছাড়লে চেঁচিয়ে ওঠে কৌশিক।

"কি বলতে চাও তুমি? তুমি নিজে আমাকে ছাড়ার কথা ভাবছ! শুধু ওই অনিমেষের জন্য। আর বিদিশাকে বললে..."

অনেকদিন পর এই প্রথম বোধহয় কৌশিকের কথা শুনতে পেয়েছে পামেলা। কৌশিক দেখে ঘরের কোনার দিকে এগিয়ে যায় পামেলা, কৌশিকের পড়ার টেবিলটার সামনে। ওখানে দাঁড়িয়ে কি বলছে পামেলা? ও কি কাঁদছে? কৌশিক বুঝে পায় না কি করবে! পামেলা যতই তার থেকে দূরে সরে যাক্‌, কিন্তু সে তো আজও ভালোবাসে। কৌশিক এগিয়ে যায় পামেলার দিকে।

"কেন তুমি এমন কথা বললে! আমি তোমাকে ছেড়ে কোথাও তো যাইনি, পামেলা!"

কাঁদতে কাঁদতে কি বলছে পামেলা! ওর হাতে কি ওটা? চমকে ওঠে কৌশিক! পামেলার হাতে তো তারই ছবি! তখনই কৌশিকের চোখ যায় তার সামনে রাখা আয়নাতে। ওই তো আয়নায় দেখা যাচ্ছে পামেলা - জানালার ধারে বসে কাঁদছে। আলো ছায়া খেলা করছে তার গায়। কিন্তু সে নিজে! কোত্থাও তো সে নেই! আয়নায় দেখা যাচ্ছে না তাকে! সামান্য ছায়াও পড়েনি তার কোথাও! কি করে সম্ভব এ!

কি করে হলো! কবে হলো!

সেই জন্যই কি পামেলা বলছিল, সে তাকে ছেড়ে চলে গিয়েছে! কিন্তু কৌশিক তো যায়নি। কি করে সে বোঝাবে সে কথা পামেলাকে!

আচ্ছা, পামেলা কি সত্যিই বুঝতে চায় আর এই কথা? মুহূর্তে কৌশিক বুঝতে পারে, পামেলার আর কোনো দরকার নেই বোঝার সে তার কাছে আছে না নেই। কৌশিক কিছুতেই তাকে বোঝাতে পারবে না। আর যদি বা পারেই, যে স্বপ্ন পামেলা দেখছে, তা তো মুহূর্তে ধ্বংস হয়ে যাবে।

না, তা সে পারবে না। সে পামেলাকে আজও ভালোবাসে। হ্যাঁ, মৃত্যুর পরেও কৌশিক পামেলাকে একই রকম ভালোবাসে।

কৌশিক বুঝতে পারে, এবার তার যাবার সময় সত্যিই এসে গেছে।



©দীপাঞ্জন মুখার্জি

-সমাপ্ত-

মন্তব্যসমূহ