ফুলের তোড়া

flower bouquet


সামনে কি এসে গিয়েছে কে জানে! বাসটা হঠাৎ সশব্দে ব্রেক কষলো।

অনেক যাত্রীই এই এগিয়ে চলার আকষ্মিক বাধাতে বেশ চমকে উঠেছেন। আঘাতও পেয়েছেন কেউ কেউ। ড্রাইভারের বাপ বাপান্ত তুলে খিস্তি করতে শুরু করল। সমীর এসব থেকে মনটা ফিরিয়ে জানালার বাইরের দিকে তাকালো।

শীত কলকাতায় হাল্কা কামড় বসিয়ে এবার বিদায় নেবার পথে। এই কংক্রিটেfর জঙ্গলে বোঝা যায়না ঠিকই, কিন্তু কখনো কখনো বসন্ত নিজের আগমনবার্তা জানান দিয়ে যাচ্ছে। ঠিক এই রকম সময়ে, কেন জানে না, সমীরেরf মনটা কি জানি কোন্‌ বিষাদে ডুব দেয়!

Depression!

অবসাদ? নাকি সেই দিনটার কথা এখনো স্পষ্ট মনে রয়ে গেছে বলে?

হ্যাঁ, কলকাতায় সেদিনও বসন্ত বেশ জাঁকজমক নিয়েই ছিল।


কতক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছিল সমীর? তা অনেকক্ষণই হবে বোধহয়। সে তো জানতো না কখন ওর স্কুল ছুটি হবে।

তারপর যখন স্কুলের গেট দিয়ে একে একে ছেলেমেয়েদের বেরোতে দেখল - সমীরের হৃৎপিন্ডটা যেন গলার কাছে উঠে এসেছে!

হ্যাঁ, সমীর ওকে ভালোবাসে। খুব ভালোবাসে। আর আজ এই কথাটা দিয়াকে জানাতেই হবে!

ওই তো বন্ধুদের সঙ্গে বেড়িয়েছে ও স্কুল থেকে। সবাই মিলে বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে দাঁড়ালো।
দিয়াও কি সকলের সঙ্গে বাসে উঠবে! তাহলে তো সর্বনাশ! আর যাই হোক্‌, এই কথাটা সকলের সামনে বলা চলে না। সমীর বাস স্ট্যান্ড থেকে একটু দূরে অপেক্ষা করতে থাকল।

দিয়া কি দেখতে পেয়েছে ওকে? একবার যেন ওর দিকে তাকালো আড়চোখে!

না! বন্ধুদের সঙ্গে গল্পেই মশগুল আছে দিয়া! শুধু ওর জন্য সমীর আজ কলেজ বাঙ্ক করল, এই দুপুর রোদে এতক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে শুধু ওরই অপেক্ষায় - দিয়ার চোখেই পড়েনি!

এক এক করে সব বন্ধুরাই বাসে উঠে গেল। দিয়া কিন্তু উঠল না। শেষ জন বাসে উঠে যেতেই ও ঘুরে তাকালো - ঠিক সমীরের দিকে!

"কি গো সমীরদা, তুমি এখানে কি করছো এখন?" দিয়া এগিয়ে এলো ওর ঠিক সামনে।

এর আগেও তো কতবার কথা বলেছে দুজনে! কিন্তু এটা ঠিক কি হচ্ছে ওর মনে! সমীর কি একটু নার্ভাস? তা হবে বোধহয়! একেই বোধহয় বলে Butterflies in the stomach. প্রেম নিবেদন করবার ঠিক মুখেই প্রজাপতিদেবের এই হঠাৎ-আনুষঙ্গে খানিক যেন মজাই পেল সমীর।

"আমি তোর সঙ্গেই দেখা করতে এসেছিলাম, দিয়া।"

দিয়ার সুন্দর টানা টানা দুটো চোখ হঠাৎ যেন কুঁচকে গেল। বিরক্তি দেখা দিল ওখানে। এমনটা তো আশা করেনি সমীর।

"আমি তোকে ভালোবাসি, দিয়া!" বলতে গিয়ে গলাটা কি একটু কেঁপে গেল সমীরের!

"দেখো সমীরদা, আমি তোমাকে দাদা হিসাবেই দেখি। এর বেশী কিছু তুমি আমার থেকে আশা কোরো না।"

দিয়ার এমন দৃষ্টি কিন্তু সমীর আগে দেখেনি। এই শীতলতা, এই বিরক্তি - এর জন্য তো সে আসেনি আজ এখানে।

"তোমার হাতে কি ওটা?"

সমীর নিজের হাতের ফুলের তোড়াটা দিতে গেল দিয়ার হাতে।

"এটা তোর জন্য দিয়া।"

"দেখ সমীরদা, আবার বলছি, আমি তোমাকে ভালোবাসি না। আর তুমি কি ভেবে এত টাকা খরচ করে এটা কিনেছো? তুমি কি ভাবলে, আমি এটা নিয়ে নেবো! তুমি ভাবলে কি করে!"

এখন আর দুচোখ তার নিজের বাধা মানছে না দেখে সমীর মুখ নামিয়ে নিল। তার গাল বেয়ে নেমে এলো জলের ধারা। চোখ ঝাপসা হয়ে গেল। চোখ না তুলেই সে বুঝতে পারল, দিয়া তার দেওয়া ওই ফুলের তোড়াটা ধুলোর মধ্যেই ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে দ্রুত হেঁটে রাস্তার বাঁকে অদৃশ্য হয়ে গেল।


দিয়া তার বাড়ি থেকে খুব দূরে থাকতো না। তাই এই ঘটনার পরেও দুজনে অনেকবার মুখোমুখি হয়েছে। সমীর বা দিয়া, দুজনের কেউই এই ঘটনা নিয়ে আর মুখ খোলেনি। তবে আগের মত সেই হাসি-ইয়ার্কির সম্পর্কটা কোথায় যেন চাপা পড়ে গিয়েছিল।

আজ পিছন ফিরে তাকালে মনে হয়, পর পর বছরগুলো যেন খুব দ্রুত চলে গিয়েছিল। দিয়ার সঙ্গে তার সম্পর্কও আবার খানিকটা ঠিক হয়েছিল অবশ্য। সময়ের এই তো মজা! আজ যা সাংঘাতিক প্রয়োজনীয় মনে হয়, কাল তাকেই মনে হয় কত অকিঞ্চিৎকর!

বেশ কিছুদিন পরে সমীর জানতে পেরেছিল দিয়া কোনো একজনের সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়েছে। কি জানি কেন, তখনও কথাটা শুনে তার বেশ ব্যাথা লেগেছিল তার। একেই কি ঈর্ষা বলে? তখনও কি সমীরের মন থেকে শেষ আশাটুকু মুছে যায়নি! এমনই হয় বোধহয়। সমীর ঠিক জানে না।
দিয়ার বিয়ের পরেও আর কোনো যোগাযোগ রাখত না সমীর।

"তুমি কোনো যোগাযোগ রাখো না কেন, সমীরদা?" দেখা হলে কতবার জিজ্ঞাসা করেছে দিয়া।

সমীর কোনো উত্তর দিত না। কি বলবে সে ওকে? সেই ফুলের তোড়া গ্রহণ না করার ব্যাথা সে যে সারা জীবন বয়ে চলেছে, এ কথা বলা কি ঠিক হবে? দিয়াও কি এ কথা বিশ্বাস করবে? কোনো মানে হয় আর সে কথা বলার?


"আপনার স্টপ আসছে", বাসের কন্ডাক্টরের ডাকে ঘোর ভাঙল সমীরের।

বাস থেকে খুব সাবধানে নামল সমীর। আজও তার হাতে ফুলের তোড়া। দিয়ারই জন্য। দিয়াকে ফুলের তোড়া দেবার এই শেষ সুযোগ সমীরের কাছে। আর সমীর জানে আজ আর তার দেওয়া ফুলের তোড়া ছুঁড়ে ফেলে দেবে না দিয়া।

দিয়ার বাড়ির দিকে এগোতেই সমীরের মনে হল, "বেশী দেরী হয়ে গেল না তো?"

না! ওই তো দিয়া!

সমীর গিয়ে ওই ফুলের তোড়াটা দিল দিয়াকে। না, আজ আর দিয়া ধুলোয় ছুঁড়ে ফেলে দিল না সেই ফুলের তোড়া।

তবু আজও যেন সমীরের দুই চোখ তার বাধা মানছে না। তার গাল বেয়ে নেমে আসছে জলের ধারা। তার মধ্যেই সে একদৃষ্টে চেয়ে রইল দিয়ার দিকে। যতক্ষণ না ওই শববাহী গাড়িটা রাস্তার মোড়ে বাঁক নিতে নিতে  চোখের জলে ঝাপ্‌সা তার দৃষ্টির মাঝে দিয়াকে নিয়ে হারিয়ে গেল।

©দীপাঞ্জন মুখার্জি

-সমাপ্ত-

মন্তব্যসমূহ