"তোমার কি কোনোদিন কোনো আক্কেল হবে না শৌনকদা!" হন্তদন্ত হয়ে টিচার্স রুমে ঢুকল শুভদীপ।
শৌনক এক মনে বসে খাতা দেখছিল। শুভদীপের কথায় শুধু একবার মুখ তুলে তাকালো ওর দিকে। তারপর আবার খাতা দেখাতেই মন দিল।
"তোমাকে তো বারণ করা হয়েছিল তো ওর গায়ে হাত তুলতে? তোমার জন্য এখন সব্বাই ঝামেলা পোহাতে হবে," শুভদীপ আবার বললো।
"যা খুশী তাই করে যাবে, আর কিছুই বলা যাবে না - এরকমই কিছু একটা বলতে চাইছো, তাই তো?" এতক্ষণে মুখ খোলে শৌণক।
সিনিয়র মাস্টারমশায় অরূপবাবু এতক্ষণ বসে বই পড়ছিলেন। এবার সেখান থেকে মুখ তুলে বললেন, "যা খুশী করলেই বা তোমার কি? তুমি তো আসবে, গাধা গরু চরাবে আর বাড়ি ফিরে যাবে।"
"গাধা গরুকে ঘোড়া করাটা আমাদের দায়িত্ব নয়, অরূপদা? তাহলে শিক্ষকতার প্রফেশনে এসেছি কেন? মাছিমারা কেরানী হলেই তো পারতাম! তাই যদি হতাম তাহলে চোখ বুজেই থাকা যেত, যেমন দেশের দশের সব ব্যাপারেই থাকি।"
"চোখটা বন্ধ রাখাই তো শ্রেয়, শৌনক। মাসের শেষে অ্যাকাউন্টে ঠিকঠাক ঢুকল কিনা, সেটাই তো শুধু দেখার বিষয়। তখনই শুধু চোখ খুলো। বাকি সময়ে চোখ বন্ধ রাখতে তো তোমাকে আগেই বলা হয়েছিল, তাই না?" অনুতোষদার মুখেও এই কথা শুনে খানিকটা হতাশ হয় শৌনক। প্রায় ছ'মাস হয়ে গেল মফস্বলের এই স্কুলটায় ইংরাজির শিক্ষক হিসাবে আসতে শুরু করেছে শৌনক। এই ছ'মাসে অনুতোষদা ছাড়া আর একজনকেও পায়নি যার সঙ্গে কথা বলে আনন্দ পাওয়া যায়। তার বারবার মনে হয়েছে ঠিক তার মনে যে কথাগুলো আসে, যেভাবে আসে, সেই একই রকম করে অনুতোষদাও ভাবে। তাই আজ অনুতোষদাও তার বিরুদ্ধে বলায় কিছুটা হতাশই হয় সে। চুপ করে যায়।
অনুতোষ বুঝতে পারে শৌণক তার কথায় বিশেষ খুশী হয়নি। তাতে অনুতোষ কিছু মনে করে না। শৌনক ছেলেটি ভালো। এবং যথেষ্ট ট্যালেন্টেড। অনেকদিন পরে এই স্কুলে এমন একটা ছেলে এলো শিক্ষক হয়ে, যার সঙ্গে নানান বিষয়ে কথা বলা যায়, কথা বলে বা তর্ক করে আনন্দ পাওয়া যায়। কিন্তু ছেলেটা এখনও বড্ড বেশী আবেগপ্রবণ। এরকম থাকলে চলে না। ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুটা কোথায় সেটা বুঝতে হবে। এবং যত তাড়াতাড়ি সেটা করে, তত ওর নিজেরই ভালো। একথা আগেও ওকে বুঝিয়েছে অনুতোষ। কিন্তু এর মধ্যেই এই কান্ডটা করে বসলো শৌনক।
ঘটনার সূত্রপাত আজ দুপুরে। টিফিন পিরিয়ড শেষ হবার ঘন্টা পড়ে যাবার পর টিচার্স রুম থেকে বেরোয় শৌণক। ওর ক্লাস ছিল টেন বি-তে। টিচার্স রুম একতলায়। আর নাইন ও টেনের প্রত্যেকটা সেকশন স্কুল বিল্ডিং-এর দোতলায়। একপেশে বানানো সিঁড়ি দিয়ে উঠে নাইনের প্রতিটি সেকশন টপকে পৌঁছতে হয় টেনের ঘরগুলিতে। শৌণক নিজের মনেই হেঁটে যাচ্ছিল তার গন্তব্যের দিকে। তখনো কোনো সেকশনেই শিক্ষকরা এসে পৌঁছয়নি। তাই টিফিন পিরিয়ডের হুল্লোড়ের রেশ কাটেনি কোথাওই। সেগুলিকে আমল না দিয়েই এগিয়ে যাচ্ছিল সে। কিন্তু নাইন সি টপকানোর সময় যে আওয়াজটা কানে এলো শৌনকের, সেটা ঠিক হুল্লোড়ের নয় - কেউ যেন কাঁদছে।
আবার ফিরে গিয়ে নাইন বি-তে ঢোকে শৌনক। এবং যে দৃশ্যটা দেখে তাতে মাথায় রক্ত চড়ে যায় তার। ওই ক্লাসেরই একটি ছেলেকে মাটিতে চেপে ধরে আছে কয়েকজন। এবং তার হাতের ওপর নিজের বুট জুতো পরা পা দিয়ে পিষে চলেছে একটি ছেলে। ছেলেটিকে চেনে শৌনক। সুদেব - এই অঞ্চলের এম-এল-এ-র পুত্র। কিন্তু কি কারণে এই অত্যাচার তা বোঝার আগেই সে গিয়ে ছেলেগুলিকে ঠেলে সরিয়ে দেয় এবং প্রধান অপরাধীর গালে সপাটে একটি চড় কষায়। এতই জোরে মেরেছিল শৌণক যে তার অভিঘাতে পড়ে যায় ছেলেটি। তারপর উঠে পড়ে নিজের গালে হাত বোলাতে বোলাতে এবং কাঁদতে কাঁদতেও ওই ছেলেটি শৌনককের দিকে তর্জনি তুলে বলে, "এটা আপনি ভালো করলেন না, স্যার। আপনি জানেন না আমি কার ছেলে। ভবানী দাস। এখানকার এম-এল-এ। আপনার স্কুলে আসা বন্ধ করে দেবো একদম।"
এরপর আর কোনো সংযম রাখতে পারেনি শৌনক। যতক্ষণে ক্লাসের ছেলেরা গিয়ে অন্য শিক্ষকদের ঢেকে এনেছে এবং তাঁরা তাকে থামিয়েছে, ততক্ষণে নিজেও ক্লান্ত হয়ে পড়েছে শৌণক।
তারপর টেনের ক্লাসটাও তাকে নিতে দেওয়া হলো না। আর এইমাত্র বেয়ারা তৃষিৎ এসে জানালো প্রধান শিক্ষক বিকাশবাবু নিজের ঘরে ডেকেছেন শৌনককে।
"নিজের এই চাকরিটার প্রতি আপনার কোনো মায়া নেই, শৌনক বাবু?"
কি ঘটেছে, কি কারণে সে এমন ভাবে হাত তুলেছে কোনো কিছু জানতে না চেয়েই বিকাশবাবু এমন প্রশ্ন করায় অবাক হয় শৌনক!
"কিন্তু স্যার, ও কি করছিল..."
"আপনার মনে আছে শৌনকবাবু", তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই শুরু করে দেয় বিকাশবাবু, "মাস ছয়েক আগে যেদিন আপনি প্রথম এই স্কুলে আসেন সেদিন আপনাকে কি বলেছিলাম আমি?"
শৌনক চুপ করে থাকে। হ্যাঁ, মনে আছে তার।
"মনে আছে, শৌনকবাবু, বলেছিলাম যে আর যা খুশী করুন, ক্লাস নাইন সি-টাকে একটু সমঝে চলবেন। ওখানে এখানকার এম-এল-এ ভবানী দাসের ছেলে সুদেব পড়ে। ওকে বা এমনকি ওর কোনো বন্ধুকেও না ঘাঁটানোই ভালো। বলেছিলাম কিনা?" জানতে চান বিকাশবাবু।
মাথা নেড়ে মেনে নেয় শৌনক।
"ওর বন্ধু বান্ধব ছেড়ে দিন। আপনি মারার জন্য পেলেন সেই সুদেবকেই। শুধু মারেনই নি, মেরে রক্তও বের করে দিয়েছেন!"
"আপনি শুনুন স্যার ও কি করেছিল! নিজের ক্লাসমেটের হাতের ওপর বুট দিয়ে চাপ দিচ্ছিল। ছেলেটার আঙুল গুলো ভেঙে যেতে পারতো, স্যার," আত্মপক্ষ সমর্থন করার চেষ্টা করে শৌনক।
"যা খুশী করুক, শৌনকবাবু। আপনি যা করেছেন, অন্যায় করেছেন। যদি এই চাকরিটা রাখার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আপনার থেকে থাকে, আপনি নিজে আজই গিয়ে ভবানীবাবুর কাছে ক্ষমা চাইবেন। আমি আর কিছু শুনতে চাই না।"
স্তম্ভিত হয়ে যায় শৌনক। অনেক আশা নিয়ে সে এই চাকরিতে যোগ দিয়েছিল। পড়াশোনায় ভালো ছিল সে। মাধ্যমিক, উচ্চমাধমিকে ফলও ভালো করেছিল। জয়েন্টে ভালো ফল করে সুযোগ পেয়েছিল ইঞ্জিনিয়ারিং-এও। শুধু ভালো ছাত্র বানানো নয়, ভালো মানুষ বানাতে চায় বলে সে এই শিক্ষকতাকেই পেশা হিসাবে নিয়েছিল। আর সে ক্ষেত্রে অধ্যাপনার চেয়ে শিক্ষকতাই তার শ্রেয় মনে হয়েছিল। কাউকে ভালো মানুষের বানানোর ক্ষেত্রে সে 'ক্যাচ্ দেম ইয়াং' থিয়োরিতেই বিশ্বাস করে। কিন্তু আজকের এই ঘটনার পর সত্যিই সে খানিকটা আঘাতই পেয়েছে। আর জানে না কি হবে! থাকবে তো চাকরিটা তার? শুধু আদর্শই নয়, নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের একমাত্র রোজগেরে শৌনকের খুবই প্রয়োজনও এই চাকরিটা।
এই স্কুল যেখানে অবস্থিত, সে জায়গাটাকে শহর তো নয়ই, মফস্বলও বোধহয় বলা চলে না। একটু উন্নত গ্রাম। এই স্কুলে যারা আসে, তারা অধিকাংশই খুবই গরীব। এর মধ্যে মধ্যবিত্ত বলতে প্রায় কেউই নেই। ধনী বলতে যারা আছেন, তাদের মধ্যে সবচেয়ে নামজাদা, সে সুনামই হোক্ বা দুর্নাম, হলেন শ্রী ভবানী দাস। ফাঁকা মাঠের মধ্যে পেল্লায় প্রাসাদের মতো বাড়ি তার। সেই বাড়ির "কুকুর হইতে সাবধান" লেখা বিরাট গেটের সামনে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল শৌনক। নিজের সঙ্গে নিজেই একটু যেন যুদ্ধ করে নিল। সে তো অন্যায় কিছু করেনি। বরং যে অন্যায় করছিল, তাকে শাস্তি দিয়েছে। সে ক্ষমা কেন চাইবে? কিন্তু চাকরিটা চলে গেলে সে এবং তার সংসার অথৈ জলে পড়বে। কাজেই উপায় তার কাছে কিছু নেই আর। পেল্লায় গেটটা ঠেলে উঠোন পেরিয়ে শৌনক যখন দরজায় এসে দাঁড়ালো, তখন বিকেল প্রায় সন্ধ্যার সঙ্গে হাত মিলিয়েই ফেলেছে।
বেল বাজাতে দরজা খুলল ঝি স্থানীয় এক মহিলা।
"ভবানী বাবু আছেন?"
"হ্যাঁ, বাবু তো খোকাবাবুকে নিয়ে ব্যস্ত। আজ খোকাবাবুকে ইস্কুলে কেউ খুব মেরেছে। উনি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।"
শৌনক আর জানালো না ওই 'কেউ'-টা সে নিজেই। শুধু বলল, "ভবানীবাবুকে বলুন সুদেব-এর স্কুলের মাস্টারমশায় শৌনক চক্রবর্তী দেখা করতে এসেছে।"
কয়েক মিনিটের মধ্যেই বেড়িয়ে এলেন শ্রী ভবানী দাস।
"আসুন আসুন শৌনক বাবু। ভিতরে আসুন।"
ভবানীবাবুকে আগেও দেখেছে শৌনক। লম্বা চওড়া চেহারা। শুনেছে এই অঞ্চলে দীর্ঘদিনের প্রতিপত্তি তাঁদের পরিবারের। কোনোকালে জমিদারিও ছিল বোধহয়। বাড়িটা তো বটেই, ওনার চেহারা দেখেও তেমন জমিদারমার্কাই মনে হয়। নিশ্চিত ছ'ফুটের ওপর লম্বা, চওড়াও কম নন। কিন্তু মেদহীন দেহ। প্রত্যহ ব্যায়াম করেন বলে মনে হয় যেন।
"আপনিই তাহলে মেরেছেন বাবুকে? ওর তো কাঁধের কাছে একদম কেটে গেছে শৌনকবাবু। রক্ত পড়ছে! আরে, দাঁড়িয়ে আছেন কেন! বসুন, বসুন!"
সামনের চেয়ারটিতে নিজেকে সমর্পন করলো শৌনক।
"ভবানীবাবু, আমি অত্যন্ত দুঃখিত সুদেব এতটা আঘাত পেয়েছে। সে আমার ছাত্র। কিন্তু সে যা করছিল তা সমর্থনযোগ্য নয়।"
"সে কি করেছে আমি জানি, শৌনকবাবু। কিন্তু আপনাকে কেউ বলে দেয়নি সুদেব আমার ছেলে?"
চুপ করে থাকে শৌনক। কি বলবে সে! এত নগ্ন ক্ষমতার অপব্যবহার সে কখনো দেখেনি এর আগে!
"চুপ করে রয়েছেন কেন, শৌনকবাবু? সুদেব যে আমার ছেলে, এখানকার এম-এল-এ শ্রী ভবানী দাসের একমাত্র সন্তান, কেউ বলে দেয়নি আপনাকে? বলে দেয়নি ও যা-ই করুক, তার বিচার করবার অধিকার আপনার নেই? এর জন্য এমনকি আপনি সাসপেন্ডও হতে পারেন?" গলা ক্রমাগত চড়ছে ভবানী দাসের।
কি বলবে শৌনক? ক্ষমতা চেয়ে নেবে? চাকরি খুব প্রয়োজন তার। বাড়িতে বৃদ্ধ মা-বাবা রয়েছেন। মা-র চিকিৎসাটার জন্যও প্রয়োজন অর্থের। কিন্তু সে কি এই জন্য এসেছিল এই শিক্ষকতার পেশায়? মুহূর্তের মধ্যে মনস্থির করে ফেলে শৌনক।
"আপনি এখানকার এম-এল-এ হতে পারেন, ভবানীবাবু। সুদেব আপনার একমাত্র পুত্র। কিন্তু আমি ওই স্কুলের শিক্ষক। আর আপনার ছেলে যখন ওই স্কুলে পড়ে, তখন সে আমার ছাত্র। তাই কিছু অন্যায় যদি সে করে, তার বিচার আমি করব বৈকি।"
নিজের কন্ঠস্বরে নিজেই অবাক হয়ে যায় শৌনক। একটু বেশীই বলে ফেলল বোধহয় সে। নিজের পায়ে নিজেই কুড়ুলটা মারল। এরপর আর চাকরিটা থাকার কোনো সম্ভাবনাই নেই। যাক্ গে, চাকরি যখন গেলই, তখন নিজের সম্মানটুকু অন্তত আজ বাঁচিয়ে রাখবেই সে। সে নিজে জানে যে সে অন্যায় কিছু করেনি।
ভবানীবাবুও বোধহয় এতটা আস্পর্ধা আশা করেননি। তিনিও চুপ করে তাকিয়ে রয়েছেন শৌনকের দিকে। ঘরে যেন এখন একটা পিন পড়লেও তার শব্দ পাওয়া যাবে।
"আপনি প্রাইভেট টিউশন করেন, শৌনকবাবু?" প্রশ্ন করেন ভবানীবাবু।
এই প্রশ্নের জন্য একেবারেই প্রস্তুত ছিল না শৌনক। এর মানে কি? প্রাইভেট টিউশন না করলে এই চড়া দামের বাজারে স্কুলের এই সামান্য মাইনেতে সে সংসার চালাতে পারতো না। কিন্তু ভবানীবাবু এই প্রশ্ন করছেন কেন? তার স্কুলের চাকরিটা যে আর থাকবে না, তা ইতিমধ্যেই বুঝেছে শৌনক। কিন্ত ভবানীবাবু কি তার টিউশনির ওপরেও থাবা বসাতে চান? তা কি তিনি পারেন? সে জানে এই দেশে দুর্নীতিপরায়ন রাজনীতিকদের ক্ষমতার দৌড় অনেক দূর পর্যন্ত। কিন্তু এতটা?
"কি শোনকবাবু? প্রাইভেট টিউশন করান আপনি?" আবার প্রশ্ন করেন ভবানীবাবু।
"হ্যাঁ, করাই।" আর কিছু না ভেবেই উত্তর দেয় শৌনক। যা থাকে কপালে।
"আপনার কাছে আমার একটা আর্জি আছে, শৌনকবাবু।" ভবানীবাবুর কন্ঠস্বরে হঠাৎ অদ্ভুত নম্রতা ও বিনীতভাব অবাক করে দেয় শৌনককে। "আপনি আমার ছেলেটাকে পড়াবেন? প্লিজ?"
"আপনি কি বলছেন, ভবানীবাবু?" কি বলবে ভেবে পায় না শৌনক!
"শৌনকবাবু, আমি জানি আপনি এখানে আমার নামে ভালো মন্দ অনেক কথাই শুনেছেন। হ্যাঁ, তার সবটা না হলেও, কিছু হয়তো সত্যি। শৌনকবাবু, রাজনীতি করতে হলে ভালোমানুষ হয়ে বসে থাকলে চলে না। তাহলে আপনাকে সবাই পিষে মেরে ফেলবে। কিন্তু আমি আর যাই হই, বোকা নই, শৌনকবাবু। অন্ধ আর কালা তো নই-ই। বরং বলতে পারেন আমার চোখ আর কানের সংখ্যা অনেক। তাই স্কুলে কে কি বলছে, কে কি ভাবছেন আপনারা আমার সম্বন্ধে, সব খবরই আমি পাই। আর সেই জন্যই ভয় হয় আমার। যে আমাকে সবাই ভয় পায় বলে, আমার ছেলেটাকে কেউ সঠিক শাসন করেন না। এতে ক্ষতি কিন্তু আমার ছেলেরই। ও-ই অমানুষ তৈরী হবে। আপনি দেখলাম সেই দলে নেই, শৌনকবাবু। আপনি আমার সামনেও ঠিককে ঠিক এবং ভুলকে ভুল বলতে ভয় পান নি। সেই জন্যই আমার অনুরোধ, আমার ছেলের ভারটা আপনি নিন।"
কি বলবে ভেবে পায় না শৌনক।
"আমি সত্যিই অভিভূত, ভবানীবাবু! কিন্তু আমি অত্যন্ত দুঃখিত। আপনার এই প্রস্তাব আমি গ্রহণ করতে পারছি না।"
চমকে ওঠেন ভবানীবাবু। তার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করছে! আশপাশের কেউ তার চোখে চোখ তুলে কথা বলতে পারে না। তিনি ভাবতে পারেন না এই অল্পবয়সী ছেলেটি এত সাহস কোথা থেকে পায়!
"আপনি কিছু মনে করবেন না, ভবানীবাবু" বলে শৌনক। "আপনার প্রস্তাবটা গ্রহণ করতে আমি অক্ষম। আপনি চিন্তা করবেন না ভবানীবাবু। সুদেব আমার ছাত্র। স্কুলে আমি তাকে যা শেখাবো, তাতে কোনো ফাঁকি থাকবে না। টিউশন ছাড়াও আপনার ছেলে ভালোই তৈরী হবে। হ্যাঁ, ভবানীবাবু, আপনি ঠিকই ধরেছেন। প্রাইভেট টিউশন আমাকে করতে হয় ঠিকই। সংসার চালাতেই করতে হয়। কিন্তু যেদিন প্রথম এই স্কুলে চাকরিতে ঢুকেছিলাম, সেদিন থেকেই নিজের কাছেই আমি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ - নিজের স্কুলের কোনো ছাত্রকে আমি পড়াবো না। শুধু টিউশনের প্রত্যাশায় স্কুলে ফাঁকি যেন কোনোদিন না দিই। এই প্রতিজ্ঞাটুকু আমার থাক্। আমাকে এই নিয়ে আর জোর করবেন না, Please. ভালো থাকবেন। নমস্কার।"
আজ বেশ দেরী হয়ে গেল। কলকাতা ফেরার ট্রেনের আশায় স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বেশ ভিড় এখন। দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে শৌনকের মনে হলো, আজ বেশ হাল্কা লাগছে তার। অনেকগুলো কথা বলে ফেলেছে সে আবেগের বশেই। তবে হ্যাঁ, সে সবই তার মনেরই কথা। এসব ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ বেশ আনন্দ হলো শৌনকের। না, সেটা সে যখন বেড়িয়ে আসছে তখন ভবানীবাবুর যে অবাক করা মুখ হয়েছিল, সেটা মনে পড়ে নয়। তার ভালো লাগছে এই ভেবে যে এখনও ভারতবর্ষের রাজনীতিকদের মধ্যেও ভবানীবাবুর মতো মানুষও আছেন, যিনি নিজের ছেলেকে অন্যায় আদর দিয়ে দিয়ে একেবারে উচ্ছন্নে পাঠাতে চান না। বরং চান সে সঠিক শাসনে থেকে মানুষের মতো মানুষ হোক্। নাঃ, দেশটার ভবিষ্যত বোধহয় ততটাও অন্ধকার নয় যতটা মনে হয়।
©দীপাঞ্জন মুখার্জি
-সমাপ্ত-

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন