ঘুমটা হঠাৎ করেই ভেঙে গেল অনির। এই নিয়ে কতবার দেখল সে স্বপ্নটা? এই সাত দিনে রোজই প্রায় দেখছে! কেন হচ্ছে এমন?
স্নেহাকে বলেছে সে অনেকবার। কিন্তু স্নেহা হেসে উড়িয়েই দিয়েছে!
"তুমি নিশ্চয়ই অফিস থেকে ফেরার পথে উল্টোপাল্টা কিছু খেয়ে আসছো। জানো না বাইরের খাবার খাওয়া তোমার বারণ! ওসব খেয়ে পেট গরম হলে এমন স্বপ্ন তো দেখবেই।"
"কিন্তু একই স্বপ্ন বারবার! আর ওই গাছটা! ওরকম আশ্চর্য গাছ তো আমি কস্মিনকালেও দেখিনি!" অনি প্রতিবাদ জানিয়েছে।
"এমন কত গাছ তুমি তোমার অফিসে যাওয়া আসার পথে দেখছ। সেগুলোই এসে বসেছে স্বপ্নে।"
"কিন্তু অ্যাক্সিডেন্টটা!"
"ওরকম কত অ্যাক্সিডেন্ট তুমি তোমার পেট গরমের স্বপ্নে তৈরী করতে পারো - কনিষ্ক তো বলেইছে, কোন্দিন দেখবে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে গেছে আর তুমি একা বেঁচে আছো। সেদিনও কি এমনই মনে হবে নাকি।"
"কনিষ্ক কিছু বললেই তো তোমার কাছে তা একদম বেদবাক্য," কনিষ্কর নামটা শুনেই কেমন যেন মাথা গরম হয়ে ওঠে অনিরুদ্ধর।
প্রমাদ গোণে স্নেহা। কনিষ্ককে কিছুতেই সহ্য করতে পারে না অনি। তাও মুখে হাসি এনে বলে, "কনিষ্কর কথা শুনলেই তোমার এমন তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠবার কি আছে, অনি!"
"না, আমি আর তেলে বেগুনে জ্বলে উঠি কেন! আমারই তো বস্। আর বস্ বলেই বুকের ওপর উঠে বসেছে।"
হ্যাঁ। স্বপ্নের কথা স্নেহাকে বলেছিল সে। স্নেহা যে কেন কনিষ্ককে বলল! বন্ধু হোক্, বাড়িতে আসুক আর যাই হোক্, অফিসে ও অনির বস্-ই। কনিষ্কর ওপরেই নির্ভরশীল অনির ভবিষ্যৎ। আর সেই সুযোগ যে সে কতবার নিয়েছে! যখন তখন বাড়িতে এসে স্নেহার সঙ্গে গল্প করা - অনির উপস্থিতিতেই হোক্ বা অনুপস্থিতিতে।
এই সকাল সকাল ওর কথা মনে করে আর মাথা গরম করতে চায় না অনি। আজ অফিসে জরুরি কাজ আছে অনেক। জলদি তৈরী হয়ে নিয়ে, ব্রেকফাস্টে স্নেহার করে দেওয়া দুটো স্যান্ডউইচ কোনোক্রমে মুখে দিয়ে, গাড়ি নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল অনিরুদ্ধ।
অনি যে ড্রাগ ম্যানুফেকচারিং অফিসে কাজ করে, সেটা ঠিক পার্ক স্ট্রিট মেট্রো স্টেশনের সামনে। অফিসের পার্কিং-এ গাড়িটা রেখে লিফ্টে উঠতে যাবার মুখে দেখা কনিষ্কর সঙ্গে।
"কি খবর অনিরুদ্ধ? এত সকাল সকাল?"
"তুমিই তো চাপে রেখেছ। কাজ তো করতেই হবে।"
"তা তো করতেই হবে। সে একটু পরে শুরু কোরো। তার আগে এসো, ক্যান্টিন থেকে একটু কফি খেয়ে যাও। অন মি।"
"না গো, এই মাত্র পেট ভরে ভাত খেয়ে এসেছি। পরে খাবো। You go ahead."
অনিরুদ্ধ হেসে এড়িয়ে যায়। কাজের চাপ আছে। এখন গল্পে সময় নষ্ট করলে হবে না। কনিষ্ক জানে অনিরুদ্ধ মিথ্যে কথা বলছে। এও জানে ওর স্যান্ডুইচে আজ কি কি ছিল। কিন্তু থাক্। একাই ক্যান্টিনের দিকে এগিয়ে যায় কনিষ্ক।
সারাক্ষণ ল্যাবে কাটিয়ে যখন নিজের ডেস্কে ফিরল অনি, বাইরে অন্ধকার হয়ে গেছে। ঝটপট কাজ গুটিয়ে বাড়ি ফেরাটা প্রয়োজন এখন।
"স্যার, দত্ত স্যার ডাকছেন আপনাকে।"
"বলতে পারলি না আমি বেড়িয়ে গেছি!" অফিসবয়ের ওপরেই ঝাল ঝাড়ে অনি। কি জানি কি দরকারে আবার ডাকছে কনিষ্ক।
"আসতে পারি?"
"আরে, এসো অনি, এসো।" এমন ভাবে বলে কনিষ্ক, যেন এত দেরী করে অনিকে ডাকেইনি ও, আশাই করেনি।
"ডেকেছিলে আমাকে?" অনি একটু তাড়া নিয়েই বলে।
"হ্যাঁ, বসো। কথা আছে।"
এই শেষ লগ্নে কথা। নতুন কাজ ধরাবে না তো! অনি প্রমাদ গোনে।
"অনি, তুমি তো জানোই আমাদের অফিস চেন্নাইতে নতুন ব্রাঞ্চ খুলছে।"
"হ্যাঁ, অবশ্যই।"
"সেখানে কাজ কেমন হচ্ছে তা জানতে তো আমি যেতাম। আমার এবারও যাবার কথা ছিল। কিন্তু আরেকটু জরুরি মিটিং অ্যাটেন্ড করতে আমাকে মুম্বাই যেতে হচ্ছে।"
"কাজেই আমার ওপর ভার পড়ল চেন্নাইয়ের দায়িত্ব সামলানোর। বুঝলাম। তা কবে যাওয়া?"
"পরশু। অসুবিধা হবে না তো?"
"হলেই বা কি আসে যায়? গুড নাইট।" হেসে কনিষ্কর ঘর থেকে বেড়িয়ে আসে অনি।
খানিক হেসে ডেস্ক থেকে অফিস ফোনটা তুলে নেয় কনিষ্ক।
"হ্যালো।"
..."ও যেতে রাজি হয়েছে।"
..."আরে চিন্তার কিছু নেই। ডাভালকর যাবে সঙ্গে। একই কুপে।"
..."আরে না না, ও চেনে না ডাভেলকরকে।"
..."কাজ সেরে চলে আসবে। আবার কি!"
..."হ্যাঁ, আজ দিতে পারো। ওভারডোজ আবার কি! কাজই হবে!"
..."ওকে বাই।"
ফোনটা নামিয়ে রেখে নিজের মনেই খানিক হাসে কনিষ্ক। অনেকদিন ধরে তাড়া দিচ্ছে ক্লায়েন্ট। এবার ড্রিম ইউভিং ড্রাগটা তুলে দিতে হবে ওদের হাতে। তার আগে এই পরীক্ষাটুকু হয়েই যাক্।
রোজ শোবার আগে এক গ্লাস গরম জলে লেবু দিয়ে খাওয়া অনির অনেকদিনের অভ্যাস। আজও স্নেহা শোবার আগে নিয়ে এলো সেটা তার জন্য।
"কাল আমার ব্যাগটা একটু গুছিয়ে রাখতে পারবে, প্লিজ?"
"কেন?" অবাক হয় স্নেহা।
"চেন্নাই যেতে হচ্ছে।"
"সে কি! হঠাৎ!" অবাক হয় স্নেহা।
"হ্যাঁ! তোমার কনিষ্কদা হঠাত-ই বলল।"
"উফ্! আমার কনিষ্কদা নয়! You're so jealous, Ani!"
"তোমার মতো সুন্দরী বউ থাকলে মাঝে মধ্যে একটু জেলাস হতে হয় বইকি!" হেসে বলে অনি।
"আচ্ছা, তুমি যে চেন্নাই যাচ্ছ, ফিরবে কবে?"
"দু'দিনের কাজ। পরশু গিয়ে শনিবার রাতেই ট্রেনে উঠবো।"
শুনে স্নেহা কেবল হাসে একটু।
আচ্ছা, ট্রেনের চেয়ে কি দুঃস্বপ্নের গতিবেগ অনেক বেশী? অনির তো তাই মনে হচ্ছে আজ!
আজ সকাল থেকেই মেজাজটা বিশ্রী হয়ে আছে । গতকাল এমনিতেই স্টেশনে পৌঁছতে একটু দেরীই হয়ে গিয়েছিল। আরেকটু হলেই ট্রেনটা মিস্ করতো। এক অবাঙালী ভদ্রলোক, মিঃ ডাভেলকর, সাহায্য না করলে হয়তো পেতই না। অবশেষে দেখা গেল উনিও লেটই ছিলেন। আর একই ট্রেনে শুধু নয়, উনিও অনিরুদ্ধর সঙ্গে একই কামরাতেই উঠেছেন।
দিনটা কোনো রকমে কাটালো বই পড়ে। তারপর ডিনার করে নিয়ে বাঙ্কে উঠে শুয়ে পড়েছিল। কিন্তু সেই এক স্বপ্ন! আবার সেই গাছ! সেই টানেল! সেই ট্রেন অ্যাক্সিডেন্ট।
মাথাটা একটু ক্লিয়ার করা চাই। বাঙ্ক থেকে নেমে পড়ে অনি। এসি কামরার বাতানুকুল পরিবেশের থেকে বাইরে আসে।
"গুড মর্নিং। ঘুম ভালো হয়েছে?"
মিঃ ডাভেলকর। টয়লেটে যাচ্ছেন।
"গুড মর্নিং।" হেসে জবাব দিয়ে মুখে চোখে জল দেয় অনি। এবার একটা সিগারেটি ধরানো যাক্। চোখটা বোজা রেখেই দরজার কব্জাটা ঘোরায়। দরজাটা খুলে দিতেই একরাশ খোলা হাওয়া মুখে এসে লাগে। আঃ! এবার একটু আরাম লাগছে।
এই প্রথম চেন্নাই যাচ্ছে অনি। বাইরের দিকে এক মনে তাকিয়ে দেখতে থাকে। রুক্ষ মাঠের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে ট্রেনটা। দূরে একটা গাছ। এক মিনিট! চম্কে তাকায় অনি! এটা তো সেই গাছটা। তার স্বপ্নে বারবার এসে হানা দিয়েছে যেই গাছটা! উঁকি দিয়ে ট্রেনের সামনের দিকে তাকায় অনি। সামনের কামরাগুলো এক এক করে ঢুকে যাচ্ছে সেই টানেলটারই মধ্যে যা সে স্বপ্নে দেখত!
কি করবে অনি! এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে? অ্যাক্সিডেন্টে মৃত্যুবরণ করবে! স্নেহা! ওর কথা বড্ড মনে পড়ছে! বাঁচবার একটা শেষ চেষ্টা করবে না! যা থাকে কপালে ভেবে চলন্ত ট্রেন থেকে ঝাঁপ দেয় অনি!
"হ্যালো, স্নেহা?"
"হ্যাঁ, বলো। কি খবর?"
"খবর তো ভালোই।"
"সত্যি!?!"
"ওমা! সত্যি নাতো কি বানিয়ে বলছি নাকি?! আমার এক্সপেরিমেন্ট সাক্সেসফুল। আর তোমার দেওয়া ড্রিম উইভারের প্রতিটি বড়ি কাজ করেছে। অনির স্বপ্ন আমরা যেমন ইচ্ছে, যেরকম ইচ্ছে কন্ট্রোল করেছি! তাই আজকের চেন্নাই মেল চেন্নাই পৌঁছেছে বটে, কিন্তু একজন যাত্রী ছাড়া। স্বর্গীয় অনিরুদ্ধ রায়!"
"বিশ্বাস হচ্ছে না আমার। সিরিয়াসলি! আই ওয়াজ সো এঙসিয়াস! আই লাভ ইউ, কনিষ্ক।" টেলিফোনের দুই প্রান্তে হেসে ওঠে কনিষ্ক আর স্নেহা।
©দীপাঞ্জন মুখার্জি
-সমাপ্ত-

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন