ভূতুড়ে হার



"বৃষ্টিটা কি একটু ধরলো?" জিজ্ঞেস করলো ইমন।

"না, আরো ঝেঁপে নেমেছে", বারান্দা থেকে ঘুরে এসে জানালো অমিত।

"আজ আর বাড়ি যেতে হবে না। মা-কে বলে দিচ্ছি সবার জন্য খিচুড়ি বসিয়ে দিতে। তাই খেয়ে ঘুমিয়ে পড় সবাই মিলে", অতনু জানালো।

আইডিয়াটা মন্দ লাগলো না। কিন্তু অদিতি গাঁইগুঁই করতে থাকল।

"আমাকে বাড়ি ফিরতেই হবে। আমি বলেছিলাম আজ আড্ডা দিতে আসব না অতনুর বাড়িতে। তোরা জোর করে আনলি।"

"তুই একটু থাম্‌ না, অদিতি", বিরক্তি প্রকাশ করল সন্দীপ্তা। "বাড়ি যাবি নাহয়, বৃষ্টিটা কমতে দে। এতদিন পরে সবাই মিলে একসাথে হয়েছি। একটু দেরী হলে কিছু হবে না।"

"হ্যাঁ, এই ওয়েদারে একটু চা আর পাঁপড় ভাজা পাওয়া যাবে, অতনু? ওর সঙ্গে ভূতের গল্প কিন্তু দারুণ জমবে", বলে ইমন। আর বলেই প্রমাদ গোণে। অতনুর সামনে ভূতের গল্পের কথা বললেই ও রেগে যায়। প্রায়ই বলে, "ওসব গাঁজাখুরি আমার পছন্দ নয়।" কিন্তু ভূতের গল্পের কথায় কাজ হলো। অদিতি অন্তত আর একটু থাকতে রাজি হলো।

"ভূতের গল্প মানেই মিথ্যে কথা। ওসব কোনো কাজের কথা নয়।" অতনু বলল। এই ভয়টাই পাচ্ছিল ইমন। কিন্তু অবাক হতে হলো অতনুর পরের কথায়। "আমি তোদের অনেকটা ভূতের গল্পের মতোই একটা গল্প শোনাতে পারি।"

"তুই আর ভূতের গল্প!" অবিশ্বাস ভরা গলায় বলল সন্দীপ্তা।

"ঠিক ভূতের গল্প নয়। একটা ডাইরি। পড়ে দেখতে পারিস। দাঁড়া, নিয়ে আসছি।" বলেই ভিতরের ঘরে চলে গেল অতনু। ইমন, সন্দীপ্তা, অদিতিরা একে অপরের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতেই করতেই ফিরে এলো অতনু। এবার ওর হাতে একটা ছোটো খাতার মতো কিছু। এটাই বোধহয় ডাইরিটা।

"তোরা আমার ছোটোমামাকে তো দেখেছিস? এই ডাইরিটা ছোটোমামার শালার মেয়ের। এই দ্যাখ্‌, নাম লেখা আছে প্রথম পাতায় - স্নেহা।"

"ওই ডাইরির ওপরে কি লেখা দেখলাম রে, অতনু?"

"মিতালি। ডাইরির নাম রেখেছে আর কি।" বলল অতনু। বলেই ইমনের দিকে এগিয়ে দিল ডাইরিটা। "নে ইমন, পড়্‌।"

"তুই পড়্‌ না, অতনু।"

"না রে, আমি পড়েছি আগে। আর সত্যি বলছি, আমি বুঝিনি কিছু। সব কিছু গুলিয়ে গেছে।"

"কি আছে এতে যে গুলিয়ে গেল?" অদিতি অবাক হয়।

"শুনেই দ্যাখ্‌।" বেশী কথা বলে না অতনু।

"আচ্ছা, তবে শুরু করছি।" ডাইরির পাতা খোলে ইমন। "লেখা আরম্ভ শুরু থেকেই, কিন্তু ডাইরি না। মনে হচ্ছে দিন মেনে লেখা হয়নি। অনেকটা চিঠির মতন। শুরু করছি, কেমন?"


প্রিয় মিতালি,
হ্যাপি নিউ ইয়ার। অভিমান করে আছো? জানি, অনেকদিন তোমার সাথে কথা বলা হয়নি। কি করবো বলো, একদম সময় পাচ্ছিলাম না। তবে চিন্তা কোরো না। আজ সময় আছে অনেক। তাই আজ এতদিনের যত জমা কথা সব বলি তোমায়। আসলে আজ তোমাকে একটা গল্প শোনাতেও খুব ইচ্ছা হলো।

আচ্ছা মিতালি, এই যে তোমার সাথে এতদিন কথা বলতে পারিনি, আসিনি তোমার কাছে, কেন বলো তো? কেন আমি এত দূরে দূরে ছিলাম, ভেবেছিলে কিছু তুমি?

আরে কিছুই না। আসলে হায়ার সেকেন্ডারি পার করে কলেজের গন্ডিতে যেই পা দিলাম, অমনি নতুন জায়গা, নতুন বন্ধু, নতুন জীবন - আমার কেমন যেন নেশা লেগে গেল! তার সাথে ব্যস্ততাও গেল বেড়ে। আমিও ভুলে গেলুম তোমাকে। তবে একদিন কিন্তু চমক্‌ ভাঙল। কিন্তু সে চমক না ভাঙলেই বোধহয় পারত। টের পেলাম, হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছি। আমার সারা গায়ে অসহ্য যন্ত্রণা। কথা বলতে চেষ্টা করলাম। গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোলো না।  শুধু মায়ের মুখের দিকে চেয়ে দেখলাম খানিকক্ষণ - চোখের নীচে জলের ধারা শুকিয়ে থাকার দাগ।

তবে আজ একদম সুস্থ বোধ করছি, মিতালি। আজ কোনো যন্ত্রণা নেই একদম। উঠে চলাফেরাও করতে পারছি। সেই জন্যই আজ আবার তোমাকে হাতে তুলে নিলাম। অনেকদিনের জমে থাকা যত কথা তো তোমাকেই বলব। তুমিই তো আমার সেই কবেকার বন্ধু, সই।

আজ দেখছি বাড়িতে অনেকেই এসেছেন। কাকামণি, কাকিমা, ভাই, জেঠু, জেঠিমা, ছোটোমাসি, মেজপিসি - আরও অনেকে। আজ বলতে পারো বাড়িটা পুরো ভরে আছে। তবে সবাই কেমন যেন চুপচাপ। হয়তো আমার এই অবস্থা বলেই। অন্য যে কোনো দিন এরা সবাই এলে আমাকে নিয়ে টানাটানি পড়ে যেত - "সোনামা কোথায় গেলি", "সোনামা এদিকে আয়" - চেঁচামেচি লাগিয়ে দিত সবাই। আজ কিন্তু কেউ আমার ঘরে আসছেও না। দরজাটা বন্ধ করা আছে সেই সকাল থেকেই।

মিতালি, তোমাকে একটা কথা বলি - একান্তে। আমার মনটা না একদম ভালো নেই। আজ বারবার স্নিগ্ধা আর অনিন্দিতার কথা মনে পড়ছে। কারা ওরা? তোমাকে বলার সময়ই তো পেলাম না। ওরা আমার কলেজের বন্ধু। বলতে পারো, ভালো বন্ধু। হ্যাঁ, কলেজে এই ক'দিনে যাদের সঙ্গে ঠিক মতো বন্ধুত্ব হয়েছে বলতে পারো, ওরা তারাই। নতুন কলেজ, নতুন লোকজন - আমাকে তো চেনই, এক নম্বরের ইন্ট্রোভার্ট। ওরা এগিয়ে এসে বন্ধুত্ব না করলে, এখনও বোধহয় একাই থাকতাম। আর তাহলে কি হতো জানো? এখনও হয়তো ওই রাই আর ওর বন্ধুরা আমাকে নিয়ে মজা করত - না, শুধু মজা না, যন্ত্রণা দিত।

ঠিক বোঝাতে পারছি না আমি কি বলতে চাইছি, তাই না? সেটাই তো স্বাভাবিক, মিতালি। কতদিন পরে তোমার সঙ্গে আমার কথা হচ্ছে বলো তো? প্রথম থেকে না বললে, তুমি বুঝবে কি করে! চলো একটু পিছন ফিরে তাকাই।

কলেজের প্রথম দিনটায় ফিরে যাই। সকাল থেকে দারুণ উত্তেজনায় ফুটছিলাম। কলেজে যাবো আজ! স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে গেছি। আর সব চেয়ে বড় কথা, দারুণ রেজাল্ট করে পাশ করেছি। স্কলারশিপ পাবার মতো। নয়তো কখনো এই কলেজে সুযোগ পাই? আমার সাধারণ মধ্যবিত্ত বেসরকারি চাকুরে বাবা আর গৃহিনী মা-র সামর্থ্যের বাইরেই বলা চলে এই কলেজ। কলেজে ঢুকে একটু ঘাবড়েই গেলাম বলতে পারো। চিরকার জেলার গার্লস্‌ হাইস্কুলে ফার্স্ট হয়ে আসা আমার কাছে ওই শহুরে কলেজে প্রথম দিনটা বোধহয় শুধু অবাক হবার দিন ছিল। কি বিরাট কলেজ, ক্লাসরুমগুলো বিরাট বিরাট। তার সাথে একটা ক্যান্টিন - অন্যরা দেখলাম বলছে ক্যাফেটেরিয়া - সেটাও বিরাট! তোমার মনে আছে মিতালি, আমাদের স্কুলে ক্যান্টিন ছিল না বলে কতবার দুঃখ করেছি তোমার কাছে? প্রথম দিন তেমন কিছু হলো না। কলেজ বাড়িটা দেখতে দেখতেই সময় কেটে গেল। মাঝে দুটো ক্লাস হলো। আর হ্যাঁ, সেদিনই প্রথম আলাপ হলো স্নিগ্ধা আর অনিন্দিতার সঙ্গে। কি সহজেই মিশে গেল ওরা আমার সঙ্গে! ভাবলাম, শহরের মেয়েরা বুঝি এরকমই হয়! কিন্তু তখনও আমার অনেক কিছু জানার বাকি ছিল।

দ্বিতীয় দিন কলেজে ঢুকে ক্লাসরুমে গিয়ে দেখি, আমার ডেস্কের কাছাকাছি কয়েকটা মেয়ে জটলা করে দাঁড়িয়ে। আমার ডেস্কের ওপর একটা মেয়ে বসে আছে। ওর জুতো পরা পা দুটো আমার বসার জায়গায়। ওদের সকলকে দেখে মনে হয়, আমাদের মতন নয়। ওদের বোধহয় আমাদের মতন অভাবের সংসার নয়। বরং জামাকাপড়, মেকআপ দেখে মনে হয়, বেশ বড়লোকের ঘরের মেয়ে।

সামনে গিয়ে বললাম, "ভাই, একটু জায়গাটা ছাড়বে। এটা আমার ডেস্ক।"

মেয়েটা নামল না ডেস্ক থেকে। অন্য একজন এগিয়ে এসে আমার কাঁধটা খাম্‌চে ধরে একটা টান মারল। আমি প্রস্তুত ছিলাম না এটার জন্য।

"তোর সাহস তো কম না। রাইকে অর্ডার করছিস!"

রাই বলে মেয়েটি এবার আমার চেয়ারের ওপর পা দিয়েই নেমে এলো ডেস্ক থেকে। নেমে অন্য মেয়েটিকে বলল, "অ্যাই লিঞ্জা, ওকে ধমকাচ্ছিস কেন?" তারপর আমার দিকে ফিরে বলল, "তুই স্নেহা তো?" আমি কাউকে প্রথম দেখাতেই তুই বলতে পারি না, মিতালি। আমাকে কেউ তুই বললেও বিরক্তই হই। তবু বিরক্ত চেপে উত্তর দিলাম, "হ্যাঁ"।

"হাই, অ্যায়াম রাই।"

বাংলা নয়। ইংরাজি। তবে আমার মতো মফস্বলের ইংরাজি নয় - রীতিমত ট্যাঁশ উচ্চারণ। সেই দিয়েই প্রথম আলাপ রাই-এর সঙ্গে।

"ওর থেকে যতটা পারবে দূরে থেকো। প্রচুর পয়সা ওদের। আর তারই গরম ওর। সেই গরমেই অন্যদের মানুষ বলেই মনে করে না।" সাবধান করে দিয়েছিল স্নিগ্ধা।

কিন্তু রাই-এর থেকে দূরে থাকা আমার আর হলো কোথায়! প্রথম প্রথম অকারণ বিদ্রুপ সহ্য করেছি। তারপর একদিন গায়ে হাত তুলেছিল বলে প্রফেসরকে বলে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম। প্রফেসর ওকে ভর্তসনা করেন। ভাবলাম অবশেষে কমবে রাই-এর দৌরাত্ব। কিন্তু ফল হলো উল্টো। তার দুদিন পরে কলেজ শেষের পর হস্টেলের দিকে ফিরছি। হঠাৎ লিঞ্জা এসে সামনে দাঁড়ালো।

"তোর সাহস হলো কি করে রাই-এর নামে প্রফেসরের কাছে লাগানোর?"
"সামনে থেকে সরো লিঞ্জা। আমি বাড়ি যাচ্ছি।"

ঠিক সেই মুহূর্তে পিছন থেকে কেউ এত জোরে ধাক্কা মারল যে আমি পড়ে গেলাম। মাটিতে পড়েই ঘুরে তাকিয়ে দেখি রাই দাঁড়িয়ে। তারপর তার বন্ধুদের নিয়ে আমাকে প্রচন্ড মারলো ওরা। মিতালি, আমার মনে আছে, মার খেয়ে আমি যখন প্রায় অচেতন, তখন আমাকে রাই একটা সজোরে লাথি মেরে, আমার গায়ে থুথু দিয়ে চলে যায়। না, মিতালি, এর পর আমার ওই কলেজে পড়ে থাকার আর কোনো ইচ্ছে ছিল না।

কিন্তু তুমি তো আমাকে চেনো। পালিয়ে আসতে আমি জানি না। সারা জীবন দারিদ্রের সঙ্গে লড়াই করেও স্কুলে প্রথম হয়েছি। মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিকে ভালো ফল করেছি। তাই ওখান থেকে নিজেই সোজা গেলাম ডাক্তারের চেম্বারে। মুখে অসহ্য যন্ত্রণা, হাত পা-র অনেক জায়গা ফেটে গেছে। ডাক্তার দেখিয়ে হস্টেলে ফিরলাম প্রায় খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। ঘরের দরজা খুলবার জন্য তালা খুলে দরজা ধাক্কা দিলাম। দরজা পুরো খুললো না। দরজার কড়ার ওপর কেউ কিছু বেঁধে রেখেছে নাকি! হাত দিয়ে দেখি একটা হারের মতো কিছু। বেশ কিছু কাঠের পুঁতি দিয়ে গাঁথা। কেউ দিয়ে গেল নাকি? হারটা হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকলাম। ঘরের আলোয় দেখলাম, কাঠের পুঁতিগুলোর ওপর ছোটো ছোটো কিছু লেখা আছে।

যা চাইবে পাবে সবই, এক-দুই-তিন,
ফেরত নেব আরও বেশী - তোমার রাত ও দিন।
তুমি কি চাও ফিরিয়ে দিতে, আমার দেওয়া সব উপহার?
সব ফেরালে তারই সাথে দিও ঠিক ওই জীবন তোমার।

এ তো প্রায় ভূতের রাজার বরের মত মনে হলো। তখন আমার একটাই ইচ্ছে - যে অপমানটা আমাকে আজ রাই করেছে, সেটা যেন ফেরত দিতে পারি। চেয়ে ফেললাম ওই হারের কাছে। কিন্তু আমি তো রাই-এর মতো গুন্ডামি পারবো না। তাহলে? তবু চাইলাম। কারণ আমি তো জানি যে এ সত্যি হতে পারে না!

কিন্তু বিশ্বাস করবে মিতালি, সে সুযোগ এসে গেল। আচ্ছা, তোমাকে তো বলেছি, ছোটো থেকে আমি নাচ করতে ভালোবাসি। কলেজে ঘোষণা হলো, নৃত্য প্রতিযোগিতা হবে। সেখান থেকেই কলেজ ফাংশানের জন্য সিলেক্‌শন হবে। নাম দিয়ে দিলাম। আর আমার সঙ্গে প্রতিযোগী আরও অনেকে। কিন্তু সব চেয়ে ভালো নাচ করে নাকি রাই! হলো নৃত্য প্রতিযোগিতা। আমার পায়ের ব্যাথা তখনো পুরো সারেনি। তবু কি করে যেন আমি প্রথম হলাম। আর কলেজের স্টেজে নাচ করতে গিয়ে পড়ে পায়ে চোট পেলো রাই।

ফাংশানের পরে আমাকে নিয়ে সবার কি দারুণ হৈচৈ!

সেদিন রাতে ফিরে আমি অনেকক্ষণ ওই হারটা হাতে নিয়ে বসে রইলাম! "যা চাইবে সবই পারে, এক-দুই-তিন..."

এও কি ভূতের রাজার দেওয়া হার? এ কি সত্যিই পারে যা চাই তাকেই সত্যি করে দিতে!

সত্যিই কি তুমি দিতে পারো যা চাইব? এ এক অবিশ্বাস্য জিনিস পেয়েছিলাম আমি। পরদিন কলেজে গেলাম প্রায় উড়তে উড়তে। ক্লাসরুমে ঢুকেই আমার চোখ খুঁজছিল স্নিগ্ধা আর অনিন্দিতাকে। স্নিগ্ধাকে দেখতে পেলাম না। অনিন্দিতা ওর নিজের ডেস্কে মাথা রেখে বসেছিল।

"কি রে অনি, সকাল সকাল কি হলো?"

অনিন্দিতা মুখ তুলতেই চমকে গেলাম। ওর চোখ লাল!

"কি হয়েছে, অনি?"

"তোর মোবাইলটায় কি হয়েছে, স্নেহা? কাল থেকে তোকে ফোন করার চেষ্টা করেই চলেছি, পাচ্ছি না কিছুতেই।"

"আমার ফোনটা তো..." মনে পড়ল, পরশু রাত থেকে চার্জ দিতে ভুলে যাওয়ায় ফোনটা কাল প্রতিবাদ জানিয়ে চুপ হয়ে গেছে। আজ সকালে বাড়িতে চার্জে দিয়ে এসেছি।

কিন্তু অনির চোখ লাল কেন?

"স্নেহা, কাল কলেজ ফাংশন থেকে ফেরার পথে স্নিগ্ধার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। কাল তোর কম্পিটিশন দেখে ফেরার পথে আমি আর ও গল্প করতে করতে ফিরছিলাম। হঠাৎ রাই আর ওর বন্ধুরা সামনে এসে দাঁড়ায়। ও তখনো খোঁড়াচ্ছিল, তবু বেশ মেজাজ নিয়ে কথা বলে।

রাইঃ কি ব্যাপার! বন্ধুকে জিতিয়ে খুব আনন্দ হয়েছে বুঝি? তাই মজা করতে করতে ফিরছ?

স্নিগ্ধাঃ হ্যাঁ, বন্ধুকে জিতিয়ে আনন্দ হয়েছে, তাতে তোমার অসুবিধা হচ্ছে বুঝি? নাচতে না জানলে যে উঠোন ব্যাঁকা হয় তা তো বোঝাই গেল। তাই খোঁড়াচ্ছ এখন।

বলে স্নিগ্ধা ঘুরে হাঁটতে শুরু করে। অপমানিত রাই স্নিগ্ধাকে পিছন থেকে একটা ধাক্কা মারে। ও হয়তো বুঝতে পারেনি, স্নেহা, ইচ্ছা করেও হয়তো করেনি, রাগের বশে করেছে, কিন্তু ওর ধাক্কার অভিঘাতে স্নিগ্ধা সোজা রাস্তার মাঝখানে ছিট্‌কে যায়। একটা গাড়ি আসছিল। তাতেই ধাক্কা মারে। কালই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বাঁ পায়ের হাড় ভেঙেছে বলে জানা গেছে। কাল রাত্রে কতবার কল্‌ করলাম তোকে! ফোন সুইচ্‌ড্‌ অফ্‌!"

আমার মাথাটা ঝন্‌ঝন্‌ করতে থাকে।

"কি ব্যাপার, বন্ধুর শোকে প্রাণ কাঁদছে নাকি?"

ঠিক পিছনেই রাই-এর হাসি শুনে চম্‌কে তাকালাম।

"কি ব্যাপার, খুব কান্নাকাটি হচ্ছে নাকি?"

রাই আমার কাঁধের কাছটা খাম্‌চে ধরে। এক ঝটকায় আমার কাঁধ ছাড়িয়ে নিই। আমার তখন কথা বলতে বিন্দুমাত্র ইচ্ছা করছিল না। তাই অনিন্দিতার হাত ধরে টান মারলাম, "চল্‌ অনি।"

রাতে বাড়ি ফেরার পরেও রাই-এর হাসির আওয়াজটা মন থেকে মুছে ফেলতে পারছিলাম না। হঠাৎ মনে এলো হারটার কথা। ড্রয়ারে রাখা ছিল। বের করে হাতে নিলাম।

"যা চাইবে পাবে সবই, এক-দুই-তিন..."

আরে, তাই তো! চেয়েছিলাম যেন জিতি আমি আর রাই হেনস্থা হয়! হয়েছে তো! তাহলে কি আরো কিছু চাওয়া যায়?

রাই-কে সত্যিই আমি আর সহ্য করতে পারছিলাম না। আচ্ছা, এমন হয় না, রাইকে বের করে দেওয়া হলো কলেজ থেকে? সাসপেন্ড করা হলো? না, জানি ওদের অনেক পয়সা। হয়তো কেউ ওর কেশাগ্রও স্পর্শ করবে না। তবু মনে হলো...আচ্ছা, কে ভেবেছিল আমি পারব নাচের প্রতিযোগিতায় রাইকে ওরকম হেলায় হারিয়ে দিতে! অথবা ও মঞ্চের ওপর ওই ভাবে পড়ে যাবে, সবাই হেসে উঠবে ওর অবস্থা দেখে! কিন্তু হলো তো!

হারটা আরও কাছে নিয়ে আসি। আরও কাছে। এনে বলি, "যা অপমান পেয়েছি রাই-এর থেকে, সব, তার সব যেন রাই ফেরত পায় কাল। ওকে যেন অপমান করে বের করে দেওয়া হয় কলেজ থেকে। লেট হার বি এক্সপেল্ড। " বলে চুপ করে বসে রইলাম অনেকক্ষণ।


পরদিন সকালে গেলাম স্নিগ্ধাকে দেখতে। না, ও ভালো নেই। ওর মা-বাবার সঙ্গে খানিক কথা বললাম। কলেজ ঢুকতে দেরী হয়ে গেল। ক্লাসে ঢুকে দেখি, থম্‌থমে পরিবেশ। সব প্রফেসররা দাঁড়িয়ে আছেন ক্লাসরুমে।

"কি হয়েছে রে অনি?"

"রত্না ম্যামের দামি ঘড়িটা হারিয়ে গেছে।"

"তো এখানে কি করছেন?"

"উনি বলছেন ক্লাসে পরে এসেছিলেন, টেবিলে খুলে রেখেছিলেন, মনে আছে ওনার। তারপর থেকে আর খুঁজে পাচ্ছেন না।"

রত্না ম্যাম কাঁদো কাঁদো হয়ে বাংলার সুচরিতা ম্যামকে বললেন, "জানো, লাস্ট অ্যানিভার্সারিতে এই ঘড়িটাই সপ্তক দিয়েছিল..."

ততক্ষণে প্রিন্সিপ্যাল ম্যাম ক্লাসে চলে এসেছেন। উনি গলা চড়িয়ে বললেন, "ক্লাস, এটা ভয়ানক একটা অপরাধ। যদি কেউ নিয়ে থাকো, ফেরত দিয়ে দাও। নয়তো আমাকে সবার ব্যাগ আর সবাইকে সার্চ করার ব্যবস্থা করতে হবে। আমি ঠিক পাঁচ মিনিট সময় দিচ্ছি।"

সবাই সচকিত হয়ে এর ওর দিকে তাকাতে শুরু করল। হঠাৎ রত্না ম্যাম চেঁচিয়ে উঠলেন, "অ্যাই রাই, তুমি কি করছো ওটা।" বলেই উনি ছুটে এসে রাই-এর হাত টেনে ধরে ওকে দাঁড় করালেন। আমরা সবাই অবাক হয়ে দেখলাম, ওর হাতে রত্না ম্যামের ঘড়ি!

প্রিন্সিপ্যাল ম্যাম রাইকে জিজ্ঞেস করেছেন, "রাই, তুমি রত্না ম্যামের ঘড়ি নিয়েছিলে?" কিন্তু রাই ওনার প্রশ্নের উত্তর দেবার আগেই আমরা ক্লাসের সবাই শুনতে পেলাম প্রচন্ড জোরে একটা শব্দ। রত্না ম্যাম তার সমস্ত রাগ নিয়ে চড় মেরেছেন রাইকে। তারপর চেঁচিয়ে উঠলেন, "আমি জানতাম ও নিয়েছে। ও-ই শুধু আমার টেবিলের কাছে এসেছিল ক্লাস চলার সময়। সেই জন্যই ওর দিকে নজর রেখেছিলাম।" বলেই ম্যাম রাই-এর চুলের মুটিটা ধরার সঙ্গে সঙ্গে প্রিন্সিপ্যাল ম্যাম ওনার হাত ছাড়িয়ে বললেন, "না রত্না, এসব নয়। বাইরে চলো। তোমরা রত্নাকে টিচার্স রুমে নিয়ে যাও।"

রত্না ম্যাম ও অন্যান্য প্রফেসররা চলে যেতে প্রিন্সিপ্যাল ম্যাম রাই-এর দিকে তাকিয়ে অসম্ভব গম্ভীর কন্ঠে বললেন, "কাম অ্যান্ড মিট মি ইন্‌ মাই রুম, রাই। ইন্‌ ফাইভ্‌ মিনিট্‌স্‌।"

সেদিন আর কোনো ক্লাস হবার কোনো প্রশ্নই ছিল না। তাই অনেকেই বাড়ি ফিরে গিয়েছিল। আমি লাইব্রেরিতে বসে বসে নোট্‌স্‌ তৈরী করছিলাম। তখন প্রায় বিকেল প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। হঠাৎ অনি দৌড়ে এসে ঢুকল লাইব্রেরি রুমে।

"স্নেহা, স্নেহা" - প্রায় চেঁচিয়ে উঠল অনি।

লাইব্রেরি রুমে চেঁচিয়ে কথা বলাও বারণ। আমি অনিকে ধরে বাইরে নিয়ে গিয়ে বললাম, "কি হয়েছে? এরকম পাগলের মতো চেঁচাচ্ছিস কেন?"

"স্নেহা, এক্সপেল্ড।"

"মানে?" ঘটনাটা নয়, আমি চমকে উঠলাম 'এক্সপেল্ড' শব্দটা শুনে।

"মানে রাইকে কলেজ থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। রত্না ম্যামের ঘড়ি চুরির অপরাধে।"

অনি তারপরে যে কত কি বলে চলে, কিছুই মাথায় ঢোকে না আমার। আমার মন তখন পড়ে আছে আমার মেসের ঘরে। আমার হারের কাছে।

জলদি মেসে ফিরে এসেই হারটাকে হাতে তুলে নিই! কি আশ্চর্য এক যখের ধন পেয়েছি! ভাবলাম গেয়ে উঠি, ভূতের রাজা দিল বর। কিন্তু না, এ নেহাৎই মহিলা সম্পত্তি। এ নিশ্চিত ভূতের রাণীর দেওয়া বর!

হারটাকে বুকের ওপর নিয়ে শুয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম! হঠাৎ ঘুম ভাঙল কোনো একটা শব্দে। কতক্ষণ ঘুমিয়েছি কে জানে! বুঝতে পারলাম মোবাইলটা বাজছে।

বাবার নম্বর! এত রাত্রে!

"হ্যালো?" তুললাম কল্‌টা।

"জুঁই, মা, তোর মা আর নেই রে মা!" ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠল বাবা!

"মানে?" চেঁচিয়ে উঠি আমি।

"আজ সন্ধ্যায় হঠাৎ রক্তবমি করে। ডাক্তার ডেকে আনতে আনতে..."

আমি আর কিছু শুনতে পাই না বাবা কি বলছে। আমার মাথায় তখন একটাই কথা ঘুরছে। হারটা আমার পাশেই ছিল। হাতে তুলে নিই। দেখি সেখানে জ্বলজ্বল্‌ করছে লেখাটা - "যা চাইবে পাবে সবই, এক-দুই-তিন, / ফেরত নেব আরও বেশী - তোমার রাত ও দিন।"

তাই তো! সত্যিই তো! এ যেমন আমাকে দিয়েছে, তেমনই নিয়েছেও তো! অনেক বেশী নিয়েছে! আরও নিচ্ছে।

বুঝতে পারছিলাম না কি করা উচিৎ! হারটাকে হাতে নিয়ে ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করলাম। পারলাম না! তখনই হঠাৎ মনে পড়ে গেল - "তুমি কি চাও ফিরিয়ে দিতে, আমার দেওয়া সব উপহার? / সব ফেরালে তারই সাথে দিও ঠিক ওই জীবন তোমার।"

হ্যাঁ, দিতে চাই! ফিরিয়ে দিতে চাই। ওই হার হাতে পাওয়ার আগে যেমন জীবন ছিল, তেমনই আবার ফেরত চাই আমি। আবার ফেরত চাই আমার মাকে, আমার বন্ধুকে। আমার জীবনটা - হ্যাঁ, সেটা হয়তো দিতে হবে, তবু আমি প্রস্তুত। হারটা হাতে নিয়ে সেই প্রার্থনাই করলাম। সেদিন রাতে আর কিছু ভাবতে পারছিলাম না। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

পরদিন ঘুম থেকে উঠেই ফোনটা হাতে নিলাম।

না, শেষ ফোনটা বাবার নয়! স্নিগ্ধার। মাকে ফোন করলাম।

"কি রে, এত সকালে? সব ঠিক আছে তো?" ওপাশ থেকে মা-র গলাটা শুনে নিশ্চিন্ত হলাম। একটু কথা বলেই রেখে দিলাম। তৈরী হয়ে বেরোলাম কলেজের দিকে।

কলেজে পৌঁছে ক্লাসের দিকে এগোতেই চেনা গলার একটা ডাক শুনলাম, "এই স্নেহা, দাঁড়া!" পিছন ফিরে দেখি স্নিগ্ধা ও অনি! বেশ খানিকটা হাল্কা লাগল নিজেকে। কিন্তু দোতলায় উঠেই সিঁড়ির মুখে দেখি রাই। এবং কোনো ভাবেই তার কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ল না।

ক্লাসের শেষে রাস্তায় বেরোলাম মেসে ফিরব বলে। বড্ড অন্যমনস্ক লাগছিল। হারটার কথা মনে পড়ছিল। হঠাৎ পিছন থেকে কেউ চেঁচিয়ে উঠল, "স্নেহা, দেখে..."। তারপর প্রবল জোরে একটা শব্দ শুনলাম। আর কিছু মনে নেই।

"খুব কষ্ট হচ্ছে?" জ্ঞান ফিরল একটা চেনা গলায়। মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল কেউ।

অবাক হলাম! বললাম, "একদম কষ্ট হচ্ছে না!"

"এমনই তো মনে হয়, বাবু"। বাবু! কতদিন শুনিনি এই ডাক! এই নামে তো একজনই আমাকে ডাকেন। চোখ তুলে দেখি দিদা হাত বুলিয়ে দিচ্ছে মাথায়। অনেকদিন পর দিদাকে দেখে মনটা ভালো হয়ে গেল।

"কেমন আছো, দিদা?" বলতে গিয়েই চমকে গেলাম! দিদা - কিন্তু দিদা তো মারা গেছেন ক'দিন আগেই! অবাক হয়ে দিদার মুখের দিকে তাকালাম। দিদা বোধহয় বুঝতে পারলেন আমার মনের কথা। স্মিত হাসলেন, তারপর বললেন, "ঠিকই ভাবছ সোনা, আমি বেঁচে নেই। কিন্তু তুমিও আর বেঁচে নেই সোনা। ওই দেখো, মা-বাবা - সবাই কাঁদছেন। তুমি চলো আমার সাথে।"

তাও তখনই যেতে পারলাম না। থেকে গেলাম আরও কিছুদিন।

কিন্তু মিতালি, আমাকে যেতে হবে এখন। ভালো থেকো।

ইতি স্নেহা।



ইমন পড়া শেষ করে। চুপ করে বসে থাকি আমরা সবাই। অতনুই প্রথম নৈঃশব্দ ভাঙেঃ "ডাইরিটা ২০১৭-র। স্নেহা মারা যায় ২০১৬ সালের মাঝামাঝি। অথচ হাতের লেখাটা ওরই।"

"অর্থাৎ তুই বলতে চাস এটা ও ওর মৃত্যুর পরে লিখেছে?" জিজ্ঞেস করে সন্দীপ্তা।

"আমি সত্যিই কিছু জানি না।"

মন্তব্যসমূহ