দড়াম করে পিছনের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। বাইরের এবড়োখেবড়ো রাস্তাটায় এসে দাঁড়ালো সমুদ্র। এতদিন এই রাস্তাটার কথা মনেই ছিল না ওর! মসৃণ রাস্তায় চলার অভ্যাস হয়ে গেল যা হয়! এই রাস্তাটার মাঝে মধ্যেই খানাখন্দ, পাথর ছড়ানো আছে এখানে সেখানে। অসাবধানে পা কেটে যায়। পথের ধারে অনেকদিনের অযত্নে বেড়ে ওঠা কাঁটাঝোপ। অনেকদিন না চলার অনভ্যাসে পা ধরে যায় সমুদ্রর। ঘরের মধ্যের সেই স্বপ্নের জগৎটা আর সত্যিই কি নেই! ঠিক যেন বিশ্বাস হতে চায় না ওর! অথচ এটা তো সত্যি, সে তো দেখতে পাচ্ছে নিজে - আজ সে এসে দাঁড়িয়েছে পথের মাঝখানে।
একসাথে পথ চলার শেষ কিছু মুহূর্তে কি যেন বলেছিল ও? সমুদ্রর কানে বাজছে এখনও কথাগুলো - "হয়তো অন্য কেউ"। এমনই তো সেদিন বলেছিল - না, নামটা থাক। মনে না করলে কি মুছে যাবে মন থেকে? তবে থাক্! পথ চলা হয়তো সহজ হবে সমুদ্রর।
এই প্রবল দুঃখের মধ্যেও কৌতুক জেগে ওঠে সমুদ্রর মনে। হঠাৎ মনে হয়, "আচ্ছা, তখন ব্যাকগ্রাউন্ডে কেন আমার প্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীতটা বাজছিল না - শিল্পী সাগর সেনের কন্ঠে 'স্বপনে দোঁহে ছিনু কি মোহে জাগার বেলা হলো'। হ্যাঁ, জেগে ওঠাই তো! এই কটা বছর যেন সত্যিই একটা ঘোরের মধ্যে কেটে গেল! এই তো সেদিনের কথা। কলেজের ক্যান্টিনের সামনে সেদিন যখন ও ওদের ডিপার্টমেন্টের জুনিয়র মেয়েটাকে প্রপোজ করলো, না, ও নিজেও ভাবেনি তার সেই প্রেম নিবেদন গৃহীত হবে! তার নিজেকে সুন্দর দেখতে, এ কথা সমুদ্র নিজেও কখনো ভাবার সাহস পায়নি। আর ও? কি জানি, সুন্দরীই হবে বোধহয়। রঙটা, হ্যাঁ, চাপা। কিন্তু ওকে দেখেই কি রবি ঠাকুর তার 'কৃষ্ণকলি' লিখেছিলেন! ওকে প্রথমবার দেখে সমুদ্রর মনে যেন ওই লাইনগুলোই এসেছিল -
এমনি করে কালো কাজল মেঘ
জ্যৈষ্ঠ মাসে আসে ঈশান কোণে।
এমনি করে কালো কোমল ছায়া
আষাঢ় মাসে নামে তমাল - বনে ।
এমনি করে শ্রাবণ - রজনীতে
হঠাৎ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে ।
আর তার কদিন পরেই রাজি। অবাক করা ব্যাপার - মুক্তোর মালা রাজি হয়েছিল বাঁদরের গলায় বসতে। হ্যাঁ, কলেজে বাদবাকি সবাই আড়ালে এমনই বলতো, জানে সমুদ্র। আর তার কারণও তো আছে। হ্যাঁ, কিছুটা হয়তো সত্যিই, কিন্তু ঈর্ষা কি নেই! কলেজে প্রায় সবাই যে ওকে চেয়েছিল। চাইবে না-ই বা কেন! সুন্দরী - হ্যাঁ, ওর চেয়ে অনেক বেশী সুন্দরী হয়তো ছিল কলেজে। কিন্তু ওর রূপে, ওর কথাবার্তায় কি যেন একটা যাদু ছিল! সেই যাদু থেকেই বোধহয় আজও বেরোতে পারেনি সমুদ্র। তাই মাঝে মাঝেই ঝাপ্সা হয়ে আসছে দৃষ্টি। কিন্তু সেদিন? সেই প্রথম দিন? আজও মনে আছে সমুদ্রর, ওকে পাশে নিয়ে যখন প্রথম হেঁটেছিল কলেজের সামনে, আর অন্যরা তাকিয়ে দেখেছিল - মনে হয়েছিল, যেন সমুদ্রের বুকে সূর্যোদয় হচ্ছে।
"হঠাৎ খুশি ঘনিয়ে আসে চিতে ।"
হ্যাঁ, এটা কিন্তু মানতেই হবে, ওকে দেখলেই মনটা খুশী হয়ে উঠত সমুদ্রর। ও-ও কিন্তু কি করে যেন দেখেই বুঝতে পারতো ঠিক যে আজ সমুদ্রর দিল খুশ্।
"কি মশাই, এতো খুশী দেখাচ্ছে কেন আজও?"
এর কি কোনো উত্তর হয়! কি বলবে সমুদ্র! কখনো কি বলা চলে, "তোমার চোখ দুটো আজ আরও বেশী গভীর দেখাচ্ছে বলে", কিংবা "তোমার কপালে ওই যে ঝুরো চুলগুলো বারবার এসে পড়ছে, আবার সরিয়ে দিচ্ছ তাদের", ওদেরই জন্য আজ আমার দিল খুশ্! ধুর্, বলা চলে নাকি একথা! পাগল ভাববে যে!
আচ্ছা, কতদিন হলো যেন?
ভাবতেও পারে না সমুদ্র! দেখতে দেখতে তিনটে বছর কেটে গেছে! এই তো সেদিনের কথা! তবু তিন বছর! আর যে কোনো সম্পর্কের মতোই বহু চড়াই উৎরাই সবই দেখেছে ওরা - একসঙ্গে। কিন্তু তারপরেই হঠাৎ, যেন বিনা মেঘে বজ্রপাত! কিন্তু সত্যিই কি তাই? কোথাও মেঘ কি জমেনি এতটুকু? কত ঝগড়া! তারপর আর কথা নেই! সমুদ্রর কত মন খারাপ করা বিকেল কেটে গেছে কবিতার বই হাতে নিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে, অন্য কোথাও মনটা পড়ে থেকেছে। কবিতা পড়তে পড়তেই মনে এসেছে অন্য কোনো কবিতার লাইন - "যে টেলিফোন আসার কথা / সে টেলিফোন আসেনি"।
তবু যেন বেঁধে রেখেছিল। কেন? মায়া? অভ্যাস? নাকি আবার এই পথে একলা নামার ভয়? হয়তো এই সবই একসাথে একটা সুতোর মতন বেঁধে রেখেছিল দুটো জীবন। হ্যাঁ, সুতোই - সেই বন্ধনহীন শক্ত গ্রন্থী কবেই টুকরো হয়ে...।
কয়েক মাস আগের সেই দিনটা মনে করার চেষ্টা করে সমুদ্র। বিকেলে যথারীতি দেখা করার কথা ছিল রাণীকুঠির মোড়ে। সেখান থেকে একসাথে গড়িয়ার দিকে যাবে, নাকি যাদবপুরে অথবা বাঘাযতীন, তা নিয়েও খানিক তর্ক হবে নাহয়। সেদিন ও যেন অনেকদিন পরে আবার হাওয়ায় হাওয়ায় চড়ে এলো।
"এই জানো, আমাদের পাড়ার জিকোদার কথা বলতাম না তোমাকে? ও আমাকে প্রপোজ করেছে আজ! আই অ্যাম সো এক্সাইটেড!"
তাকে রাগানোর এই পদ্ধতি সমুদ্রর অজানা নয়। কতবার এমন করেছে ও! আর তাছাড়া, এরকম ঘটনা কি কম ঘটেছে নাকি! এ তো হতেই পারে। কিন্তু এর ক'দিন পরে যখন ও এসে বলল, "হয়তো অন্য কেউ! অন্য কাউকে ভালোবাসি আমি...।" তখনও সমুদ্র কি সে কথা সত্যি ভেবেছিল? কিন্তু না ভাবলেও, এবার কোনো ভুল রইল না। সময় সমুদ্রকে জানাল, "তোমার সরে যাবার সময় হয়েছে, সমুদ্র"।
হ্যাঁ, ওর সরে যাবার সময় হয়েছে।
তাই সরে এসেছে সমুদ্র। জোয়ারের সময় পেরিয়ে গিয়েছে। এখন ভাঁটার টান। তিনটে বছর তীরের কাছে কাটিয়ে আবার ফিরে এসেছে সমুদ্র। পিছনে তটে পড়ে রইল কত ঝিনুক, মণিমুক্তো - সারা জীবনের সঙ্গী।
তারপর রাস্তায় এসে দাঁড়িয়ে পড়লো সমুদ্র। দড়াম করে পিছনের দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
©দীপাঞ্জন মুখার্জি
-সমাপ্ত-

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন