কি ক'রে?



মোবাইলের তীব্র রিংটোনে চমকে জেগে উঠল রিঙ্গা। কটা বাজে! ঘড়ির দিকে তাকালো। দামি ওয়ালক্লকের ফস্‌ফরাস মাখানো কাটা গুলো বলছে  রাত দুটো বেয়াল্লিশ! শীতের রাতের আলিস্যি ঝেড়ে, লেপ সরিয়ে উঠতে উঠতে ফোনটা কেটে গেল। মাত্র দু'বার রিং হলো! এত রাতে কে ফোন করল!

ঐশানি!

ফোনে নম্বরটা দেখেই মাথাটা গরম হয়ে গেল রিঙ্গার। এত সাহস কি করে হয় ওর! রিঙ্গার মোবাইল নাম্বারটাই বা ও পেল কোথা থেকে! হ্যাঁ, রিঙ্গার কাছে অবশ্য আছে ঐশানির নাম্বার। সে তো থাকতেই হবে! কার নাম্বার নেই রিঙ্গার কাছে! সবারই আছে। আর ঐশানিরটা তো থাকবেই। ও তো যাকে বলে রিঙ্গাদের সফ্‌ট্‌ টার্গেট। রিঙ্গারা কম জ্বালাতন করেছে ওর ফোনে কল্‌ করে?

রিঙ্গা ওই নম্বরে কল্‌ ব্যাক করে।

"আপনার ডায়াল করা নম্বরটি সুইচ্‌ড অফ্‌ রয়েছে।"

মিস্‌ কল দিয়েই বন্ধ করে দিয়েছে ফোনটা। বড্ড বেশী সাহস বেড়ে গেছে তো ওই ঐশানির! কাল ওর ব্যবস্থা করতে হবে। আবার ঘুমোবার চেষ্টা করে রিঙ্গা। গরমকালে গরম মাথায় ঘুমটা সব সময় ভালো ভাবে হয় না।

পরদিন উঠতে দেরীই হয়ে গেল রিঙ্গার। ইতিমধ্যেই সাড়ে নটা বাজে। রোজ সকালে বাবার গাড়িতে করে ঠিক দশটায় কলেজের জন্য বেড়িয়ে পড়ে ও। আজ আর হবে না।

"ড্যাড, আমার জন্য ওয়েট কোরো না। আজ আমি নিজের গাড়ি নিয়েই চলে যাব।" বাবাকে জানিয়ে দিল রিঙ্গা।

ব্রেকফাস্ট সেরে নিজের গাড়ি নিয়ে যখন কলেজে পৌঁছলো, তখন প্রায় এগারোটা বাজে। রিঙ্গা ঠিক করেই এসেছিল, আজ এসেই ঐশানিকে টাইট দেবে আজ। কিন্তু কলেজে পৌঁছেই মনে হলো কিছু একটা হয়েছে। থম্‌থমে ভাব। গাড়িটা পার্ক করে কলেজে ঢোকার মুখে দেখা অর্চিতার সঙ্গে।

"বস্‌, শুনেছো তো কি হয়েছে?" অর্চিতা বলল।

"কি হয়েছে? জানি না তো কিছু!"

"সে কি! জানোই না!" আকাশ থেকে পড়ে অর্চিতা। "ঐশানি - তোর মুরগি - কাল রাতে সুইসাইড
করেছে। গলায় দড়ি দিয়ে!"

স্তম্ভিত হয়ে যায় রিঙ্গা।

"তুই ঠিক করিসনি, রিঙ্গা।"পাশ থেকে বলে অঙ্কিতা। "আমরা বারণ করেছিলাম তোকে। তুই শুনলি না।"

"মানে? কি বলতে চাইছিস তুই?" চেঁচিয়ে ওঠে রিঙ্গা। "ও আমার জন্য মারা গেছে?"

"কাল তুই বড্ড বাড়াবাড়ি করেছিস রিঙ্গা। এটা তোকে মানতেই হবে।"

"কিচ্ছু বাড়াবাড়ি না। কিচ্ছু বাড়াবাড়ি নয়। র‍্যাগিং-এ এইটুকু হবেই।"

"এতদিন ধরে র‍্যাগিং কাউকে করে না, রিঙ্গা। তুই যা করেছিস, ওটা টর্চার। কাল যেভাবে ওকে মেরেছিলি..."

"চুপ কর্‌। বেশ করেছি মেরেছি। ওর ভাগ্য ভালো শুধু ওইটুকু মেরেছি। সিনিয়রের মুখে মুখে তর্ক করবে, আর কিছু বলা যাবে না!"

আর কেউ কিছু বলে না। সবাই বুঝতে পারে, রিঙ্গা স্বীকার করবে না তার দোষ।

রিঙ্গা মনে মনে অন্য কথা ভাবে। হঠাৎ বলে ওঠে, "সুইসাইড! তুই ঠিক জানিস অর্চি? কাল রাতে ও আমাকে মিস্‌ কল দিয়েছিল হঠাৎ।"

"মানে? কটার সময়?"

"এই ধর্‌ আড়াইটে।"

"হতেই পারে না! পুলিশ বলছে ও তার আগেই মারা গেছে, রিঙ্গা! তুই স্বপ্ন দেখেছিস।

"আমি সিওর! এই দ্যাখ্‌!" ফোন খুলে কল লিস্ট দেখায় রিঙ্গা।

"কিন্তু পুলিশ তো বলছে মৃত্যুর সময় রাত একটা থেকে দেড়টা!" সম্পূর্ণ কন্‌ফিউস্‌ড্‌ লাগে অর্চিতাকে।

হঠাৎ রিঙ্গা বুঝতে পারে, এই শীতেও ওর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম ফুটে উঠছে।

"কি সব বলছ তুমি, রিঙ্গাদি! আমার কিন্তু খুব ভয় করছে।" পাশ থেকে বলে ওঠে শ্বেতা। রিঙ্গা কিছু বলে না। ও ঠিক বুঝতে পারে না কি বলবে।

******************************************************************************

কলেজ ছুটি দিয়ে দিল। কিন্তু বাড়ি ফিরেও ঐশানির কথাই মনের মধ্যে ঘুরতে থাকে রিঙ্গার।

প্রথম যখন দেখেছিল রিঙ্গা ঐশানিকে - এখনও মনে আছে - লাইব্রেরির সামনে থেকে অর্চিতা ওকে ডেকে এনেছিল কলেজ ক্যাফের বাইরের সিঁড়িটায়। ওদের ফেবারিট রকে।

"ঐশানি, এই যে এদিকে এসো। রিঙ্গা, ও ঐশানি। ফার্স্ট ইয়ার - বাংলা ওনার্স। আর ঐশানি, এঁকে চিনে রাখো। এ হলো রিঙ্গা - আমাদের কাপ্তান।"

"তোমরা এখানে বসে আছো কেন? ক্লাস করো না তোমরা?"

এই একটা প্রশ্নেই ঐশানিকে চেনা হয়ে গেছিল ওদের। বোকা মেয়ে! আর কাউকে কিছু বলার সাহস ছিল না। সত্যি, ওকে নিয়ে যা খুশী তাই করা যায়। আর কি না করেছে রিঙ্গা ঐশানির সাথে!

রোজ সকালে কলেজে গিয়েই রিঙ্গার প্রথম কাজ ছিল ঐশানিকে ডাকা। তারপর র‍্যাগিং। না, রিঙ্গা ওটাকে ঠিক র‍্যাগিং বলতে রাজি নয়। বরং বলা চলে, সামান্য একটু মস্তি।

কেউ কেউ প্রতিবাদ করেনি তা নয়। ঐশানি তো কিছু বন্ধু জুটিয়েছে ইতিমধ্যেই - ওই দেবযানী, সুরঙ্গমা, ওরা। প্রথম প্রথম প্রতিবাদ করতে এসেছিল ওরা।

এই যেমন একদিন ঐশানিকে দিয়ে নিজের ব্যাগটা বওয়াচ্ছিল রিঙ্গা। সুরঙ্গমা হঠাৎ এসে প্রতিবাদের নাটক করতে গেল।

"এটা ঠিক হচ্ছে না, রিঙ্গাদি। নিজের ব্যাগটা ওকে দিয়ে বওয়াচ্ছ। ও কিছু বলে না বলে..."

আর কিছু বলতে পারেনি সুরঙ্গমা। রিঙ্গা শুধু সজোরে একটা চড় কষিয়েছিল যার ধাক্কায় মাটিতে পড়ে গেছে ওই সুরঙ্গমা।

"বেশী কথা! জিভ টেনে ছিঁড়ে দেব, শুয়োরের বাচ্চা।"

তারপর থেকে সুরঙ্গমা কেন, আর কেউই কিছু বলেনি ওদের।

কিন্তু কাল কি একটু বেশীই হয়ে গিয়েছিল?

রিঙ্গা কিন্তু বলতে পারে, সে খুব বেশী কিছু করেনি। হ্যাঁ, ফার্স্ট ইয়ারের অনেকগুলো ছাত্রী তখন ক্যাফেতে এসেছিল। ওরা যখন বেরোচ্ছে, ঠিক তখনই রিঙ্গা খেয়াল করে, ওদের সঙ্গে ঐশানিও আছে।

"অ্যাই ঐশানি, এদিকে শোন্‌।" ডাক দিয়েছিল রিঙ্গা।

রিঙ্গা বাজি রেখে বলতে পারে যে ওর ডাক শুনে ঐশানি ঘাড়টা অর্ধেক বেঁকিয়ে একবার তাকিয়েছিল তার দিকে, কিন্তু তারপর না শোনার ভান করে হাঁটা লাগালো কলেজ বিল্ডিং-এর দিকে।

রিঙ্গাকে কিছু বলতে হয়নি। ও শ্বেতা আর সুদীপ্তার দিকে তাকাতেই ওরা দৌড়ে গেল ঐশানির দিকে।

"কি হলো, ঐশানি। শুনতে পাচ্ছিস না, রিঙ্গাদি ডাকছে?" সবার সামনে ঐশানির হাত ধরে টানতে টানতে ওকে রিঙ্গার কাছে নিয়ে এলো শ্বেতা।

"কিরে, আজকাল ডাকলে শুনতে পাস না!" গম্ভীর ভাবে বলেছিল রিঙ্গা। ততক্ষণে সে খেয়াল করেছে ফার্স্ট ইয়ারের যারা সকলে ছিল, তারা সবাই দাঁড়িয়ে পড়েছে। তাদের সকলেই রিঙ্গাদের চেনে, তাই কেউই সামনে আসার সাহস পাচ্ছে না। কিন্তু সকলের চোখ ঐশানিরই দিকে।

এই সুবর্ণ সুযোগটা কি করে ছেড়ে দেয় রিঙ্গা!

"কি হলো, ঐশানি, উত্তর দিচ্ছিস না যে? আজকাল ডাকলে শুনতেও পাস্‌ না! ব্যাপার কি?"

ঐশানি নিশ্চুপ থাকে। কিন্তু ওর বন্ধুদের সামনে ঐশানিকে হেনস্থা করার সুযোগটা ছাড়তে চায় না রিঙ্গা।

"এদিকে আয়, এখানে। শুনে যা।" বাধ্য মেয়ের মতো এগিয়ে আসে ঐশানি। ও বুঝতে পেরেছে আজ রিঙ্গা সহজে ছাড়বে না। রিঙ্গা কিন্তু ভেবেছিল তেমন কিছু বলবে না ওকে। কিন্তু ওর মুখের দিকে তাকিয়ে এই প্রথমবার মনে হলো একটা প্রতিবাদের আভা যেন ফুটে উঠছে। আর প্রতিবাদ জিনিসটা একদমই সহ্য করতে পারে না রিঙ্গা।

"ঐশানি, একটা কাজ কর, আমার জুতোটাতে কাদা লেগেছে, একটু পরিষ্কার করে দে।" নিজের জুতো সমেত পা-টা ঐশানির মুখের সামনে তুলে ধরে রিঙ্গা।

ঐশানি ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে।

"কি হলো, শুনতে পেলি না?" ধমকের সুরে প্রশ্ন করে রিঙ্গা।

"রিঙ্গাদি, তুমি কিন্তু এবার বাড়াবাড়ি করছ।" ঐশানির শান্ত কিন্তু কঠোর স্বর অবাক করল রিঙ্গাকে।
কিন্তু বিস্ময়ের ঘোর বেশীক্ষণ থাকতে দিল না। উঠে দাঁড়িয়ে সজোরে একটা ধাক্কা দিল ওকে। সেই ধাক্কার চোটে ও মাটিতে পড়ে গেলে ওর গায়ে লাথি মেরে পা দিয়ে ওকে প্রায় পিষে দিয়ে নিজের রাগ কমিয়েছিল রিঙ্গা।

"তুই ওকে এতটা না মারলেই পারতিস, রিঙ্গা। খুব বাজে ভাবে কেটে গেছে ওর মুখটা।" সুদীপ্তা বলেছিল।

পাত্তা দেয়নি রিঙ্গা। কি করতে পারে সে! ছোটো থেকেই যা চেয়েছে এক কথায় পেয়েছে সে। তাই মুখে মুখে তর্কটা একদম সহ্য করতে পারে না রিঙ্গা। ওর মাথায় রাগ চেপে বসে। মা অনেকবার বলেছে, "মেয়ে মানুষের এত রাগ ভালো নয়।"

"কেন নয়?" জানতে চেয়েছে রিঙ্গা। আর কোনো ঠিকঠাক উত্তর সে পায়নি। তাই রাগের ওপর লাগাম পরানোর পরিশ্রম করতে তার ভারি বয়েই গেছে।

কিন্তু আজ আর রাগ নয়। কি একটা অস্বস্তি যেন চেপে ধরেছে রিঙ্গাকে। বাড়ি ফিরে কিছু না খেয়েই নিজের ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে দিল ও। খানিকক্ষণ পায়চারি করে বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। লাইটটা জ্বলুক। আজ আর লাইট নেভানোর ঠিক সাহস হলো না রিঙ্গার।

******************************************************************************

আবার মোবাইলের শব্দে ভেঙে গেল ঘুমটা। সেদিন রাতেও তো ঠিক এক, একই ঘটনা ঘটেছিল। আর তার পর থেকেই ভালো করে ঘুমোতে পারছে না রিঙ্গা। আজ আবার কে? ঘুম চোখে বালিশের পাশ থেকে মোবাইলটা তুলে হাতে নেয় রিঙ্গা।

ঐশানির নাম্বার!

এক নিমেষে ঘুম ভেঙে যায় রিঙ্গার। ফোনটা কি ধরবে? কে হতে পারে? ঐশানির মা-বাবা কেউ! কিন্তু তারা কেন ওকে ফোন করতে যাবেন? তাও আবার এই রাতে!

"হ্যালো!" কল্‌টা রিসিভ করে রিঙ্গা।

ওই পার সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ।

"হ্যালো, কে বলছেন?" আবার বলে রিঙ্গা।

"বাঁচাও!" ওপার থেকে রিসিভারে ভেসে আসা চিৎকারে চমকে ওঠে সে।

"কে! কে বলছেন! কি হয়েছে?"

"বাঁচাও!" গলাটা বড্ড চেনা চেনা লাগছে রিঙ্গার। কোথায় শুনেছে সে?

"কে বলছেন বলুন!"

কোনো উত্তর পায় না ওপার থেকে।

হঠাৎ আবার নৈঃশব্দ ভেঙে যায় রিসিভারের ওপারের কন্ঠস্বরে।

"ভুল হয়ে গেছে! ভুল হয়ে গেছে। সরি! আমাকে ক্ষমা করে দাও..." কথা শেষ করতে পারে না ওই কন্ঠস্বর। তার আগেই গোঙাতে শুরু করে। ঠিক যেন তার গলায় দড়ি দিয়ে ফাঁস দিচ্ছে কেউ, আর সেই ফাঁসে বন্ধ হয়ে আসছে দম।

দর্‌দর্‌ করে ঘামছে রিঙ্গা। তার নিজেরই যেন দম বন্ধ হয়ে আসছে!

সে চিনতে পেরেছে ওই কন্ঠস্বর কার!

ওটা তার নিজের স্বর।

******************************************************************************

কলেজ থেকে বাড়ি ফিরেই স্নানঘরে ঢুকল রিঙ্গা। ও এমনিতে শীতকাতুরে। তাই এই শীতের সন্ধ্যায় গায়ে জল ঢালার কথা ভাবতেও পারে না। কিন্তু আজকাল কলেজে গেলে গা ঘিন্‌ঘিন্‌ করে রিঙ্গার। সবাই যেন দেখছে তার দিকে। সবাই যেন আঙুল তুলছে রিঙ্গার দিকে। ও-ই যেন খুন করেছে ঐশানিকে!

আরে বাবা! কলেজে সামান্য এসব হয়েই থাকে। এর জন্য কেউ সুইসাইড করে! তার মানে ওর অন্য কোনো সমস্যা ছিল! অথচ সবাই মিলে এমন ভাব দেখাচ্ছে, যেন রিঙ্গা খুনি। কলেজে সকলে এড়িয়ে যাচ্ছে ওকে! একমাত্র অঙ্কনা এখনও কথা বলে ওর সঙ্গে।

"তুমি চিন্তা কোরো না রিঙ্গাদি। ওরাও কথা বলবে আবার তোমার সঙ্গে।"

"আমি জানি না অঙ্কনা। সবাই আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছে সমানে।"

রিঙ্গা বলল বটে যে সকলে এড়িয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সে নিজে তা অনুভব করছে না। হ্যাঁ, সবাই হয়তো এড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ একজন তার খুব কাছে কাছেই থাকছে। আসছে, যাচ্ছে। অনুসরণ করছে।

কিন্তু কে?

গত শনিবার দুপুরে দিদুনের সঙ্গে দেখা করতে যাবে বলে বাড়ি থেকে বেড়িয়েছিল। গাড়িতে বসে সারাক্ষণ মনে হলো কেউ তার ওপর নজর রাখছে। অথচ সে জানে সে নিজে আর ড্রাইভার কেষ্টদা ছাড়া গাড়িতে আর কেউ নেই! দিদুনের সেভেন্থ ফ্লোরের ফ্ল্যাটে ঢোকার জন্য লিফ্‌ট থেকে নেমে করিডর দিয়ে এগোতেই মনে হলো সামনের আধো-অন্ধকারে দরজার সামনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে! অথচ দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দেখল নেই কেউ!

এসব কথা ভাবতে চায় না রিঙ্গা! অন্তত যতক্ষণ সে বাড়িতে আছে। বাড়ির মধ্যে তবু সে নিরাপদ।
স্নানঘর থেকে বেড়িয়ে রিঙ্গার মনে হলো, আজ আর খেতে ইচ্ছে করছে না।

"মা, ডোন্ট কল্‌ মি ফর ডিনার টুডে। আমি খাবো না আজ।"

"কেন, কি হলো আবার!"

মাকে কথা শেষ করতে না দিয়ে সশব্দে নিজের ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে বিছানায় ঝাঁপ দেয় রিঙ্গা।

ঘরের লাইটটা জ্বলছে। জ্বলুক। ঐশানির মৃত্যুর পর থেকে কেন যেন একটা ভয় তাকে সবসময় জাপটে ধরে আছে। অন্ধকারে এখন ভয় পায় রিঙ্গা। রোজকার মতো তাই লাইট জ্বালিয়েই শুয়ে পড়লো ও।

কিসের আওয়াজ হলো?

চমকে ঘুম থেকে উঠে পড়লো রিঙ্গা। সাথে সাথে হাতটা চলে গেল বালিশের পাশে রাখা মোবাইলের দিকে। না, কেউ তো কল্‌ করেনি! মানে, মোবাইল বাজেনি। তাহলে ঘুম ভাঙলো কিসে!
ঘরটা অন্ধকার কেন! সে তো আলো জ্বালিয়েই শুয়েছিল! আবার মোবাইলটা হাতে নেয় রিঙ্গা।

ক'টা বাজে?

রাত দুটো বেয়াল্লিশ।

মোবাইলের আব্‌ছা আলোতে রিঙ্গার মনে হলো, ঘরের কোণে যেন কেউ দাঁড়িয়ে! কিন্তু সে তো ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করেই শুয়েছিল!

"কে?" জানতে চায় রিঙ্গা।

কেউ উত্তর দেয় না।

"কে ওখানে?" রিঙ্গা বুঝতে পারে গলা শুকিয়ে আসছে তার।

"কেমন আছো, রিঙ্গাদি?"

কার গলা এটা! খুব চেনা!

"কি হলো, রিঙ্গাদি? উত্তর দিচ্ছ না যে! কেমন আছো তুমি?"

"কে? কে তুমি?"

"সে কি! চিনতে পারছো না আমায়, রিঙ্গাদি! অথচ সব সময়ই তো আজকাল আমার কথাই ভেবে চলেছ মনে মনে!"

"ঐশানি?" অবিশ্বাসের সঙ্গে বলে রিঙ্গা।

"এই তো, চিনতে পেরেছো!"

"ঐশানি - কিন্তু এ হতে পারে না! ঐশানি, তুই তো..."

"মারা গেছি?" হেসে ওঠে ঐশানি! "সে তো বটেই রিঙ্গাদি। নয়তো এখানে এত রাতে কি ভাবে আসবো, বলো?"

"কি করে হয়! ঐশানি, তুই তো সুইসাইড..."

"না রিঙ্গাদি। সুইসাইড নয়। ওটা বোলো না। সুইসাইড করার কোনো ইচ্ছা আমার কোনোদিনই ছিল না। কিন্তু রিঙ্গাদি, তুমি সেদিন যা করেছিলে, তারপরে তো আর কোনো উপায় ছিল না। একে তুমি কি বলবে রিঙ্গাদি, সুইসাইড? খুন না?"

"আমি ইচ্ছা করে কিছু করিনি ঐশানি..."

"না, ইচ্ছার বিরুদ্ধেই তুমি করেছিলে - তাই বলতে চাইছ তুমি? তাহলে সেদিন আমার হাতটা যখন তুমি পিষে দিচ্ছিলে তোমার ওই দামি, হিলতোলা জুতো দিয়ে..."

রিঙ্গার হাতে হঠাৎ অসম্ভব যন্ত্রণা হচ্ছে! কারণ কি এর! নীচের দিকে চোখ নামিয়ে দেখার চেষ্টা করে রিঙ্গা।

"আআআআআআ"...চিৎকার করে ওঠে রিঙ্গা। "অ্যায়াম সরি! আমাকে ক্ষমা করে দাও ঐশানি। ক্ষমা..."

"আমার ঠিক এরকমই মনে হয়েছিল আমার, রিঙ্গাদি! আমি কিছু করিনি! তবু আমার মনে হয়েছিল তোমাকে বলি, সরি রিঙ্গাদি। আমাকে ক্ষমা করে দাও!" চিৎকার করে ওঠে ঐশানি, নাকি ওর প্রেতাত্মা!
একদম সামনেই যেন এসে গেছে ঐশানি। চোখ তুলে দেখে রিঙ্গা।

"গলায় দড়ি দিলে কি রকম কষ্ট হয়ে, তুমি জানো রিঙ্গাদি?"

চমকে ওঠে রিঙ্গা! কি বলতে চাইছে ঐশানি?

"তুমি জানবে না, রিঙ্গাদি?"

মাটিতে বসে পড়ে ঐশানির হাওয়াতে মিলিয়ে যাওয়া পা ধরার চেষ্টা করে রিঙ্গা।

"ভুল হয়ে গেছে! ভুল হয়ে গেছে। ক্ষমা করে দাও..." কথা শেষ করতে পারে না রিঙ্গা। তার আগেই গোঙাতে শুরু করে। তার গলা টিপে ধরেছে ঐশানির অদৃশ্য হাত। ঠিক যেন রিঙ্গার গলায় দড়ি দিয়ে ফাঁস দিচ্ছে কেউ, আর সেই ফাঁসে বন্ধ হয়ে আসছে দম।

******************************************************************************

দরজা ভিতর থেকে বন্ধ। ঘরে কেউ ঢুকেছিল, তার কোনো চিহ্ন নেই। বরং বাড়ির সিসিটিভি বলছে রিঙ্গা ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করার পর দরজা খোলা হয়নি, পরদিন সকালে ভাঙতে হয়েছিল। গলায় কোনো আঙুলের দাগ নেই। অথচ পোস্টমর্টেম বলছে ডেথ বাই থ্রটলিং।

ডাক্তার বলছেন, কোনো মানুষ এত জোরে কারো গলা টিপে ধরতে পারে না!

তাহলে কে বা কি?

রিঙ্গার মৃত্যুর কারণ আজও খুঁজে চলেছে পুলিশ!


মন্তব্যসমূহ