সমাধান


"তুমি তাহলে ঠিক করেই ফেলেছ?" হঠাৎ প্রশ্নটা শুনে চোখ তুলে তাকায় মৃত্তিকা। দেখে জয়ন্ত এসে দাঁড়িয়েছে ওর ডেস্কের পাশে।

"হ্যাঁ ভাই। পরশুই তো শেষ দিন। কিন্তু চিন্তা কোরো না। যোগাযোগ থাকবে।" সামান্য হেসে বলে মৃত্তিকা।

"মিথ্যে কথা বোলো না। তুমি যে এতদিন এখানে বসতে, সেটাই তো আমরা ভালো করে টের পেতাম না, মৃত্তিকাদি। ছেড়ে চলে গেলে তুমি তো আমাদের হাত থেকে হাঁপ ছেড়ে বাঁচবে। তখন আর যোগাযোগ মোটেই রাখবে না।" অভিযোগ জানায় অপরাজিতা।

"আমি কিন্তু এখনো তোমার রেসিগনেশনটা রিজেক্ট করতে পারি, মৃত্তিকা। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত।" বলে জাকিরদা।

মৃদু হাসে মৃত্তিকা। প্রতিবাদ করে না। প্রতিবাদ করার কোনো কারণও নেই। মিথ্যে কথা তো বলছে না অপরাজিতা। প্রায় আট বছর এই কোম্পানিতে কাজ করল সে। সেই বিয়ের আগে থেকে। কাজের বাইরে তার আর কোনো সম্পর্ক এই কোম্পানির সঙ্গে ছিল না তার। জয়ন্ত, অপরাজিতারা প্রায়
প্রতি সপ্তাহেই শুক্রবার অফিসের পরে একসঙ্গে কোথাও সময় কাটাতে যেত। উইকএন্ড পার্টি আর কি। সারা সপ্তাহের হাড়ভাঙা খাটুনির পরে একটু হাল্কা হওয়া। কতদিন ওরা মৃত্তিকাকে বলেছে ওদের সঙ্গে যেতে। রাজি হয়নি মৃত্তিকা। অফিসে ও কাজই করেছে এত বছর। বন্ধু তৈরী করতে পারেনি তেমন। আর অফিসেই বা শুধু কেন? স্কুল, কলেজ, পাড়া - অফিসের বাইরেও কোথাওই তেমন বন্ধু ওর নেই। তাতে খুব বেশী দুঃখও ওর নেই।

অফিস শেষে সল্টলেক সেক্টর ফাইভ থেকে গড়িয়াহাটের বাসে বসে এই কথাই ভাবছিলো মৃত্তিকা। ও বুঝতে পারে না কেন ও কিছুতেই তেমন সহজ ভাবে মিশতে পারে না কারো সাথে! হ্যাঁ, ঘরকুনো সে ছিল।। খেলাধুলার চেয়ে সব সময় বই নিয়ে ডুবে থাকতেই ভালোবাসত।

স্কুলের বন্ধুরা যখন খেলায় মেতেছে, ও ঘরে বসে বই-এ মুখ গুঁজে থেকেছে। কলেজের সহপাঠীদের সঙ্গেও কফিহাউস বা রেস্তোরাতে বিশেষ যাওয়া হয়নি ওর কখনো। তবে ঘরকুনো বা বইপোকার চেয়েও বেশী ও বোধহয় লাজুক। কারো সামনে সহজে কিছুতেই কথা ফোটে না। এই জন্য অবশ্য লোকে ওকে ভুল বোঝেনি এমন নয়।

"মৃত্তিকা? ও আবার আসবে নাকি? ওর তো বড্ড নাক উঁচু।" কেউ কেউ বলেছে। আবার কোনো কোনো সহপাঠিনী আঁতেল বলেও অভিহিত করেছে ওকে বারবার। খারাপ কি একদমই লাগেনি মৃত্তিকার? লেগেছে। কিন্তু ও বদলাতে পারেনি নিজেকে। কখনও নিজে থেকে এগিয়ে গিয়ে কথা বলে
বন্ধু বানানোর ক্ষমতা ওর ছিল না। কিন্তু তাই বলে ওর মনের দরজাটা খুলে দেওয়া তেমন কিছু কঠিন ব্যাপারও নয়। শুধু উদ্যোগটা সে নেবে না। সেটা অন্য কাউকে নিতে হবে। যেমন দেবাঞ্জন নিয়েছিল।

এখন আবার ফিরে দেখতে একটু কষ্টই হয়।

কবে দেখা হয়েছিল প্রথম দেবাঞ্জনের সঙ্গে? সৃজিতার জন্মদিনে, ওর বাড়িতে। সচরাচর সহপাঠিনীদের বাড়িতে যেত না মৃত্তিকা। কিন্তু সৃজিতা শুধু সহপাঠিনী তো ছিল না। ও-ই কলেজে একমাত্র ছিল যাকে মৃত্তিকা বন্ধু বলতে পারত। তাই ওর জন্মদিনে যেতেই হয়েছিল।

সৃজিতার মা-বাবার সঙ্গে আলাপ হয়েছিল। তারপর অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিল মৃত্তিকা। তারপর সৃজিতা ওকে একটু সময় দিতে পারায় নিশ্চিন্ত হল। দুজনে যখন গল্প করছে, হঠাৎ পাশ থেকে কেউ বলে উঠল, "আরে সুমি, তোর বন্ধু তাহলে কথা বলতে পারে! আমি তো ভেবেছিলাম ও বোবা!"

নিজের স্মৃতিশক্তি দেখে অবাক হয়ে যায় মৃত্তিকা। এখনও কি সুন্দর মনে আছে প্রতিটি দিন, প্রতিটি মুহূর্ত!

এর পরও দেবাঞ্জনই প্রথম এগিয়ে এসেছিল। হঠাৎ একদিন মৃত্তিকার মোবাইলে একটা অচেনা নম্বর থেকে ফোন।

"হ্যালো।"
"হ্যালো, কেমন আছো মৃত্তিকা?"
"কে বলছেন?"
"তুমি যে বোবা নও তা তো সেদিনই জেনেছি। কিন্তু ওইটুকু কথায় মন ভরেনি সেদিন। আর খানিক কথা বলতে চাই। সুযোগ দেওয়া যায়?"

ওকে জিজ্ঞেস না করে ওর নম্বর দেবাঞ্জনকে দিয়ে দেওয়ায় সৃজিতার ওপরে ভিষণ চটেছিল মৃত্তিকা। ওর সঙ্গে প্রায় এক মাস কোনো কথা বলেনি। কিন্তু দেবাঞ্জনকে নিরাশ করেনি। দেখা করেছিল ওর সঙ্গে। অনেকবার। মনে মনে সৃজিতাকে ধন্যবাদও দিয়েছিল কিন্তু। বিয়ের সময়ে তো সৃজিতা সব সময়ে ছিল সঙ্গে সঙ্গে।

আজ একেক সময় মনে হয় সৃজিতাকে দোষারোপ করে। ও যদি দেবাঞ্জনের সঙ্গে আলাপটা না করাতো, তাহলে এই ডিভোর্স, এই ডামাডোলের জীবন হয়তো দেখতে হতো না মৃত্তিকাকে। কি দরকার ছিল! এত ভালোবাসা, এত কথা - একসাথে হতে গিয়েই সবকিছু শেষ হয়ে গেল। না, যখন নিরপেক্ষ দৃষ্টিতে দ্যাখে মৃত্তিকা, ও বুঝতে পারে শুধু দেবাঞ্জনকে দোষ দেওয়া যায় না। হ্যাঁ, ইগোটা বড্ড বেশী ছিল দেবুর। কিন্তু সেই একই দোষ কি ওর নিজেরও নেই। যাকে আত্মসম্মান বলে ও ভেবে এসেছে, যে বিষয়ে কোনো আপস করতে ও রাজি হয়নি, সেখানেই যদি সামান্য নমনীয় হত দুজনেই, তাহলে হয়তো এই সম্পর্কটা বেঁচে যেত। সময়ে একবারও মনে হলো না এই কথা! তবু পূর্বরাগের সময়টা আজও ভোলা যায় না।

ওই সময়টা বোধহয় মৃত্তিকার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের সময়। মৃত্তিকা দেখল, একটা ফুল যেমন করে পাঁপড়ি মেলে ক্রমে ফুটে ওঠে, ওর মনটাও যেন ঠিক সেরকমই। দেবাঞ্জনের সামনে তাই ওর কথা ফুটে উঠত। কলকাতার কত অচেনা রাস্তায় রাস্তায় ওরা ঘুরেছে তখন দুজনে। সেই সময়টা, সেই শহরটার থেকেই তো সে পালাতে চাইছে। সেই জন্যই তো ও ব্যাঙ্গালোরে চাকরী নিয়ে নিয়েছে। চলে যাচ্ছে আগামী সপ্তাহেই।

সেই সময়ের কথা মনে হলেই সেই সন্ধ্যাগুলোর কথা মনে পড়ে যায় মৃত্তিকার। তখন পকেটে পয়সাও ছিল না, কোনো বড় বড় রেস্তোরাতে গিয়ে বসার সাধ বা ক্ষমতা কিছুই ছিল না। কিন্তু প্রায় রোজ দুজনে যাদবপুরের কফি হাউসে গিয়ে সময় কাটিয়েছে কত!
আচ্ছা, ব্যাঙ্গালোর যাবার আগে একবার ঘুরে যাবে না ও কফি হাউসটা? কটা বাজে? সাড়ে ছটা।

কোথায় এলো?

একবার বাস থেকে বাইরের দিকে তাকায় মৃত্তিকা। বিজন সেতু। চট করে উঠে পড়ে সিট ছেড়ে। নেমে পড়ে গড়িয়াহাটে। আজ একটু দেরী করে বাড়ি পৌঁছলে কিছু হবে না। অটো নিয়ে চলে আসে যাদবপুর।

সেই যাদবপুর। সেই এইট বি বাস স্ট্যান্ড। ইউনিভার্সিটির গেটটার দিকে একবার তাকায় মৃত্তিকা। খুব ইচ্ছে করছে একবার ভিতরে যেতে। কিন্তু আজ সময় হবে না।

স্যাঁতস্যাঁতে সিড়িগুলো পেরিয়ে যাদবপুর কফি হাউস। ডানদিকের শেষের আগের টেবিলটাতে বসত ও আর দেবাঞ্জন। এগিয়ে যায় ওদিকেই। কিন্তু ওখানে একটা ছেলে আর একটা মেয়ে বসে আছে। কোণার দিকে একটা ফাঁকা চেয়ারে একলা বসে মৃত্তিকা। এর আগে কোনোদিন কি একলা বসতে হয়েছে? না। দেবাঞ্জন কোনোদিন দেরী করত না। ওকে অপেক্ষা করতে হয়নি কখনো। বরং দেবাঞ্জনই অনেকদিন একলা বসে অপেক্ষা করেছে ওর। আজ একলা বসে থাকার ব্যাথাটা যেন প্রথমবার অনুভব করলো মৃত্তিকা।

"কি দেব, ম্যাডাম?"

মেনুকার্ডটা হাতে নিয়ে অপেক্ষারত ওয়েটারের দিকে তাকায় মৃত্তিকা। আরে, এই চাচা তো তখনও ছিলেন। ওরা এলে ইনিই তো এগিয়ে আসতেন অর্ডার নিতে। তবে উনি চিনতে পারেননি মৃত্তিকাকে। স্বাভাবিক। একটা ইনফিউশন, একটা চিকেন স্যান্ডুইচ আর একটা চিকেন কবিরাজি অর্ডার করে অপেক্ষা করতে থাকে মৃত্তিকা। এত অর্ডার দেখে ওয়েটার চাচা বোধহয় অবাকই হলেন।

"আচ্ছা, কি পাও বলো তো ওই বিরক্তিকর স্যান্ডুইচে? কোনো স্বাদ নেই। এর চেয়ে একদিন চিকেন কবিরাজিটা খেয়ে দ্যাখো। দারুণ খেতে।" রোজ বলত দেবাঞ্জন।

আজ অনেকদিন পরে চিকেন স্যান্ডুইচটা খারাপ লাগল না। কিন্তু চিকেন কবিরাজিটা বেশী খেতে পারল না। ওটা এখনও ওর ঠিক পছন্দ হয় না। ফেলে রেখেই উঠে গেল।

এইট বি স্ট্যান্ড থেকেই বাস পেয়ে যাবে। ওদিকেই এগিয়ে গেল। যেদিনগুলো কফিহাউসেও যাবার টাকা থাকত না, সেই দিনগুলো ও আর দেবাঞ্জন এই স্ট্যান্ডের কোণায় দাঁড়িয়ে গল্প করত। কোণার দিকে একটু এগোতে যায় মৃত্তিকা।

কারা বসে আছে ওখানে? তার আর দেবাঞ্জনেরই মতন হাত ধরে বসে।

বাস ছাড়ার সময় হয়ে গেছে। জানালার ধারে বসে দৃশ্য দেখতে থাকে মৃত্তিকা। না, বাইরের দৃশ্য দেখছে না ও। ওর মাথার মধ্যেই নানা দৃশ্য পাক খাচ্ছে। মনের মধ্যে আনাগোনা করছে দেবাঞ্জনের লেখা প্রিয় কবিতাটার লাইনগুলো -

আবছা হয়ে আসে ট্রামবাস
উধাও হতে থাকে রাস্তাঘাট
কলকাতার অলিগলি,
এঁদো পুকুরপার।
মুছে যায় ভিক্টোরিয়া আর
ঝাপ্‌সা হয় মিলেনিয়াম পার্ক,
লুকিয়ে যায় পুরোনো এই শহর।
মাঝেমধ্যেই কামড় দেবে ঠিকই
সব-হারানো নাছোড়বান্দা স্মৃতি
হঠাৎ যখন চাইবো একলা হতে,
কিন্তু তবু এ সত্যটা জানি
ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেছি আমি
ভেসে গেছি ঝাপ্‌সা জলস্রোতে।
এই কথা তো সত্যি চিরদিনই
ইতিহাসের কলম নেয় ছিনিয়ে
শেষের খেলায় জয় হয়েছে যার
তাতে যদি মুছেও যায় কথা
ভাবনা নেই, সবাক নীরবতা
বলবে গল্প তোমার-আমার।

কার থেকে পালাচ্ছে ও? ব্যাঙ্গালোরে গেলে একটুও বদলাবে এই দৃশ্য? ওর, দেবাঞ্জনের ছেড়ে যাওয়া জায়গাগুলো সব আবার একই ভাবে ভরে গেছে! কিন্তু ও তো নিজেদেরই খুঁজে যাচ্ছে সবার মধ্যে। যেটা হয়েছে, তার থেকে পালানোটা সম্ভব নয়। দেবাঞ্জনকে ভুলে থাকতে হবে, কিন্তু তার সঙ্গে এই প্রিয় শহরটাকে ভোলার চেষ্টা সে কেন করবে! আর এই শহর নয়, সব কিছু ভুলতে গেলে নিজের থেকেই পালাতে হবে ওকে। সেটা তো সমাধান হতে পারে না!

কি করবে ও? বাস থেকে নেমে বাড়ির দিকে হাঁটতে হাঁটতে মোবাইলটা বের করে ডায়াল করে মৃত্তিকা।

"হ্যাঁ মৃত্তিকা, বলো।"

"হ্যালো জাকিরদা। বলছিলাম, আমার রেসিগনেশনটা রিজেক্ট করা যাবে, প্লিস?"

-সমাপ্ত-

মন্তব্যসমূহ