প্রত্যাবর্তন



হঠাৎ মোবাইলের আওয়াজে চমকে উঠল। ঘড়ির দিকে তাকায়। রাত পৌনে একটা।

এত রাত্রে কে ফোন করছে? মোবাইলের স্ক্রিনে ঋতির নামটা ফুটে উঠেছে।

ফোনটা হাতে তুলে নিল সীমন্তিনী।

"বল্‌ ঋ। এত রাতে?"

"ঘুম আসছে না রে, সীনি। কিছুতেই মাথা থেকে মুছে ফেলতে পারছি না ঘটনাটা। কি করে যে কি হয়ে গেল, বুঝতে পারছি না। এতটা এগোতে হবে, তুইও তো বলিসনি আমাদের, সীনি।"

"তুই কি সব দোষ শুধু আমার ঘাড়ে চাপানোর জন্য এত রাত্রে ফোন করলি?" হিস্‌হিসিয়ে ওঠে সীমন্তিনী।

"না না, শুধু তোর ঘাড়ে নয়। কিন্তু তুই অতটা মাথা গরম না করলে তো..." বলে ওঠে ঋতি।

"তো? কি হত?"

"না, কিছু না। আচ্ছা, থানা থেকে কেউ এসেছিল তোর কাছে?" জানতে চায় ঋতি।

"তোর মাথার ঠিক নেই এখন, ঋ। ফোন রাখ। ঘুমো।" ঋতিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে ওর মুখের ওপরেই ফোনটা রেখে দেয় সীমন্তিনী।

নাহ্‌, প্রায় এক ঘন্টা হয়ে গেল চেষ্টা করছে। ঘুম আজ ওরও আসছে না। ঘরের আলোটা কিছুতেই নেভাতে পারছে না। অথচ ঘুম না হলে শরীর খারাপ করবে। কাল ফার্স্ট আওয়ারেই একটা জরুরি মিটিং আছে। ওটা কিছুতেই স্কিপ করা যাবে না।

ফোন রেখে বিছানা ছেড়ে উঠে বাথরুমে যায় সীমন্তিনী। বেসিনের সামনে দাঁড়িয়ে ছোটো ছোটো করে ছাঁটা চুলে একটু জলের ছিটে দেয়। ঘাড়ে, মাথায় ভালো করে জল দেয়। ঠিক বিশ্বাস হতে চায় না নিজেরই। সে যা করেছে অন্যায় কিছু করেনি। সেই বিশ্বাসটুকু তার নিজের আছে। তারপরেও এইটুকুতেই এতটা ঘাবড়ে যাবে সে! নাহ্‌, এটা হতে পারে না।

ঘরের আলোটা কিছুতেই নেভাতে পারছে না। নেভালেই মনে হচ্ছে পায়ের কাছে কেউ এসে দাঁড়িয়ে আছে। যেন একটা ছায়াময় মূর্তি। কে, সে জানে না। কিন্তু সেই ছায়ার মাঝেই যেন কোথায় ফারজানার শরীরের আদল ফুটে উঠছে। নাকি কৃষাণুর?

না, আলো জ্বালিয়েই শোবে সে। ঘুম আসাটা খুব দরকার আজ। একটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে নিলেই দারুণ ঘুম হবে এখন।

শহরের জনবহুল থেকে রাস্তাটা ঠিক যেখানটাতে বাঁক নিয়ে এই ছিমছাম, সমৃদ্ধ মানুষদের বড় বড় বাড়ি-ওয়ালা পাড়াটার হাতছানিতে সাড়া দিতে ছুট লাগায়, ঠিক সেইখানটায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে বিরাট কৃষ্ণচূড়া গাছটা। সীমন্তিনীর ঘরের জানালার ঠিক বাইরেই একটা হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে সেই গাছ। যেন কত সহজেই ছোঁয়া যায় এই জানালা দিয়ে তাকে। কতদিন নিজের বিছানায় শুয়ে ঘরের জানালা দিয়ে ওই গাছটার দিকে তাকিয়ে থেকেছে  সীমন্তিনী - দেখেছে কেমন করে নিজের শেষ বসন্তে নিজের লাল পাঁপড়িগুলো হাওয়ায় ছড়িয়ে দিয়ে রাস্তাটাকে সাজিয়ে তোলে! এই রাতেও পাশের আলোকস্তম্ভের থেকে এসে পড়ে আসা আলোতে ভারি সুন্দর লাগছিল গাছটাকে। ওষুধটা মুখে দিয়ে গ্লাসটা তুলে গলায় জল ঢালতে ঢালতে গাছের দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠে সীমন্তিনী। হাত থেকে পড়ে যায় গ্লাসটা। ওই কৃষ্ণচূড়া গাছের ওই কাছের ডালে কি দেখা যাচ্ছে ওটা? কার ঝুলন্ত দেহ? ফারজানার? নাকি সীনির নিজের?

******************************************************************************

"এত ক্লান্ত লাগছে কেন আজ তোমাকে? ঘুম হয়নি কাল রাতে?" খাবার নিয়ে টেবিলে বসতে বসতে প্রশ্ন করে ঋতি।

"তোর হয়েছে?" জিজ্ঞেস করে সীমন্তিনী।

কথা হচ্ছিল ক্যান্টিনে বসে লাঞ্চ খেতে খেতে। সীমন্তিনীর কথা বলতে একদমই ইচ্ছে করছিল না। তাই এক কথায় উত্তর সারল। না, সত্যিই কাল রাত্রে অনেক চেষ্টা করেও ঘুম আনতে পারেনি। যখনই ঘুমে সামন্য বুজে আসছিল চোখ, ফারজানার শেষ দৃষ্টিটা মনে আসছিল। কি বলতে চাইছিলো ও?

অফিসের পরিবেশ এখনো স্বাভাবিক হয় নি। সেটা হওয়ারও কথা নয়। হঠাৎ করে একই অফিসের দুজন কর্মী যদি সুইসাইড করে, অনেক সময় লাগে সবার নিয়মের বেড়াজালে ফেরত আসতে। তাতে তেমন চিন্তিত নয় সীমন্তিনী। কিন্তু সকলের মনে যখন অযথা প্রশ্ন জাগে, আর সে সব প্রশ্নই যখন সীমন্তিনীর জন্যই হয়, তখনই বিরক্ত লাগে। হ্যাঁ, কয়েক মাস আগেও ফারজানা নয়, কৃশানুর সঙ্গে সম্পর্ক ছিল সীমন্তিনীরই। সারা অফিস তা জানে। তাই এখন মাঝে মাঝেই তার প্রতি সমবেদনার বর্ষণ হচ্ছে। আর সেটাই অসহ্য লাগছে সীমন্তিনীর।

সীমন্তিনী জানে সে যা করেছে তা-ই ঠিক। এ ছাড়া আর কোনো উপায় ছিল না। তিন বছর ধরে তিল তিল করে গড়ে তোলা সম্পর্ক - তাকে একদিনে শেষ করে দিতে চাইলে, তার ফল তো ভুগতে হবেই। তা-ই হয়েছে কৃষাণুকে।

না, সেদিন ওরকম কিছু ঘটতে পারে, তার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না সীনির। কৃষাণুকে শুক্রবার থেকে ক্রমাগত ফোন করার পরেও সে ফোন না ধরায় সীমন্তিনী সোজা পৌঁছে গেছিল ওর ফ্ল্যাটে। হ্যাঁ, ওকে দেখে নিশ্চিত ভাবেই অবাক হয়েছিল কৃষাণু।

"একি! তুমি?!"

"কেন? আমার আসতে নেই নাকি? ফোনের পর ফোন করে চলেছি, ধরছ না কেন?"

"আমি তোমাকে আগেও বলেছি, সীনি। আমি তোমার সঙ্গে আর কোনো রকম সম্পর্ক রাখতে চাই না।"

এর পরে যে উত্তপ্ত বাদানুবাদ হয়েছিল, তার পরে নিজের মাথা ঠিক রাখা সম্ভব ছিল না সীমন্তিনীর পক্ষে। কৃষানূর টেবিলে যে ভারি কড়াইটা ছিল, সেটা হাতে নিয়ে কৃষাণুর মাথার দিকে চালিয়েছিল সে। মাথায় লাগতেই সোজা মাটিতে পড়ে যায় কৃষাণু। রক্তে ভেসে যায় ঘর। সম্বিত ফিরতেই ওর নাড়ি ধরে সীমন্তিনী বুঝেছিল কি ভয়ঙ্কর কাজ সে করে ফেলেছে। না, ফল ওরকম হবে সে ভাবেনি। ভয় তো সীমন্তিনীও পেয়েছিল ঠিকই। নাহলে ঋ-কে ও ফোন করে তক্ষুণি চলে আসতে বলত না। কিন্তু সমস্যা হয়েছিল তার পরে। ঋ আসার পর হঠাৎ-ই ফ্ল্যাটে কেউ এসে উপস্থিত হয়। বহুবার ডোরবেল বাজানোর পরেও কোনো সাড়া দেয়নি সীমন্তিনী বা ঋতি। দুজনেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়েছিল, যাতে সামান্য শব্দও হয়। বাইরে থেকে কেউ বুঝতে না পারে, ভিতরে কৃষানূ ছাড়া আর কেউ আছে।

ফারজানা এসেছিল। সীমন্তিনী একবারও ভাবেনি কৃষাণুর ফ্ল্যাটের একটা চাবি ফারজানার কাছেও থাকতে পারে। যতদিন তার সঙ্গে কৃষের সম্পর্ক ছিল, সে নিজে কোনোদিন ওর ফ্ল্যাটের চাবি নেয়নি।
ভিতরে ঢুকে চেঁচিয়ে উঠেছিল ফারজানা, কিন্তু তার সাময়িক ধাক্কা কাটাতেই চোখ পড়ে ঋতির ওপর।

"ঋতি, তুমি?"

পিছনে সশব্দে দরজা বন্ধ হওয়ার আওয়াজে ঘুরে তাকায় ফারজানা। দেখতে পায় সীমন্তিনীকে। মূহুর্তে সবকিছু পরিষ্কার হয়ে যায় ওর কাছে।

"ও! তাহলে তুমি করেছো এই কাজ। কেন, সীমন্তিনী? তুমি না একদিন ভালোবাসতে ওকে?"

হেসে ওঠে সীমন্তিনী।

"ও যদি সেই ভালোবাসার প্রতিদান দিতে না পারে, ও যদি তোমার ফাঁদে পা দিয়ে আমার জীবনটা নষ্ট করে, তাহলে আমার কি করার থাকে বলো?"

"তাই বলে...আমি এক্ষুণি পুলিসে ফোন করছি।" মোবাইল বের করতে যায় ফারজানা।

কিন্তু পারে না। ততক্ষণে ঋতি পিছন থেকে চেপে ধরেছে ওকে। ঋতির প্রশংসা করতেই হবে। কোথা থেকে একটা দড়ি জোগাড় করেছিল।

"সীনি, ও বেঁচে থাকলে আমি আর তুই শেষ হয়ে যাব", বলেছিল ঋতি।

ফারজানার মুখ ও হাত বেঁধে ফেলে সীমন্তিনী। তারপর যখন ওর গলায় ফাঁস দিয়ে দুজনে মিলে ধরে ওকে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে দেয়, ফারজানার কথা বলার কোনো উপায় ছিল না। শুধু মুখ থেকে গোঁ গোঁ করে শব্দ করছিল। না, ফারজানার ওপরে রাগ থাকলেও, ওকে মেরে ফেলতে চায়নি সীমন্তিনী। শেষ মুহূর্তে ওর চোখে দেখেছিল...


"ওহ্‌ মাই গড্‌!"

ঋতির আচমকা চিৎকারে চমকে ওঠে সীমন্তিনী। ওর ভাবনার স্রোত ভেঙে যায়। কিন্তু এ কি! চোখ প্রায় ঠিকরে বেড়িয়ে আসছে ঋতির। ও তাকিয়ে আছে ঠিক সীমন্তিনীর মাথার ওপরেই।

"ও...ও তোর পিছনে দাঁড়িয়ে আছে, সীনি!" চেঁচিয়ে ওঠে ঋতি। "প্রতিশোধ..."

"এই ঋ, ঋ, কি হয়েছে তোর?" চেঁচিয়ে ওঠে সীমন্তিনী। ওর চিৎকারের পরেও প্রায় দু'মিনিট পরে সম্বিত ফেরে ঋতির। ততক্ষণ ধরে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে ছিল ঋ।

"কি হলো তোর, ঋ?" সীমন্তিনী জিজ্ঞেস করে।

লাঞ্চ করার সময় থেকে প্রায় এক ঘন্টা কোনো কথা বলেনি ঋতি। চুপ করে থেকেছে, চোখে ভয়ের ছাপ। এই অবস্থায় ওকে একা একা মেসে গিয়ে থাকতে দেওয়া উচিত হবে না।

"তুই কি আজ আমার বাড়িতে থাকবি?" বাড়ি ফেরার পথে ঋতিকে জিজ্ঞেস করে সীমন্তিনী।
ঋতি কিছু বলে না। শুধু তার দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।

বাড়ি ফিরেও চুপ থাকে ঋতি। সীমন্তিনী বোঝে না কি হয়েছে ওর। খানিক পরে স্নান সেরে ঘরে ঢুকে সীমন্তিনী দ্যাখে, বিছানার কোণটা দখল করে শুয়ে পড়েছে ঋতি।

"কি রে ঋ, ঘুমিয়ে পড়লি যে! খাবি না, ঋ?" জিজ্ঞেস করে সীমন্তিনী।

ঋতি কোনো উত্তর দেয় না। সীমন্তিনী পোষাক বদল করে, খেয়ে এসে, ঘরের আলো নিভিয়ে শুয়ে পড়ে ঋতির পাশে।

হঠাৎ ঘুম ভেঙে যায় সীমন্তিনীর। সারা দেহে অসম্ভব যন্ত্রণা হচ্ছে ওর। ঘাড় ঘুরিয়ে পাশ ফেরে। পাশে ঋতি নেই। উঠে বসতে গিয়ে সীমন্তিনী টের পায়, তার দুই হাত পিছমোড়া করে বাঁধা, দুই পা একসাথে জড়ো করে বাঁধা।

ঘরের অন্ধকার চোখে সয়ে আসে। ঘরের মাঝখানে চেয়ার টেনে ফ্যানে হাত দিয়ে কি করছে ঋতি? ফ্যানের থেকে ফাঁস ঝুলছে!

"কি করছিস, ঋ?" চেঁচিয়ে ওঠে সীমন্তিনী।

ঘুরে তাকায় ঋ। ওকে দেখে চিনতে পারে না সীমন্তিনী। ওর চোখে পাগলিনীর দৃষ্টি।

"ঋ! কি হয়েছে তোর? কি করছিস?"

ঋতি কোনো উত্তর দেয় না। সীমন্তিনীকে ধরে টেনে নামিয়ে আনে বিছানা থেকে। মেঝেতে ঘষটাতে ঘষটাতে নিয়ে চলে জানালার দিকে।

"আঃ! ঋ, লাগছে আমার।"

ঋতি থামে এক মুহূর্তের জন্য। ঘোলাটে চোখে সীমন্তিনীর দিকে তাকায়। বলে ওঠে, "আমারও লেগেছিল, সীমন্তিনী। আমিও এভাবেই আকুতি করেছিলাম তোমাদের কাছে।"

চমকে ওঠে সীমন্তিনী! এ কার স্বরে কথা বলছে ঋ! এই স্বর তো ঋ-র নিজের নয়। অথচ এই স্বর সীমন্তিনীর খুবই পরিচিত!

"কি হলো, কার কন্ঠস্বর বুঝতে পারছো না, সীমন্তিনী?"

সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে যায় সীমন্তিনীর, এ গলা তো...

"ফা-র-জা-না!" আতঙ্কে বলে ওঠে সীমন্তিনী।

"হ্যাঁ, সীমন্তিনী, আমি ফারজানা-ই। তুমি সেদিন থেকে ভেবে চলেছ না, শেষ মুহূর্তে আমার দৃষ্টি দিয়ে কি বলতে চাইছিলাম? আমি শুধু এটুকুই বলছিলাম, সীমন্তিনী, আমি ফিরে আসবোই।"

সীমন্তিনীকে টেনে নিয়ে জানালার পাশে নিয়ে যায় ঋতি...নাকি ফারজানা? ঠিক তখনই সীমন্তিনীর চোখে পড়ে জানালার বাইরে কৃষ্ণচূড়ার ডালে ঝুলছে একটা ফাঁস। সমস্ত ঘটনা খুব চেনা লাগে সীমন্তিনীর। যেন স্বপ্নে দেখা।

জানালার বাইরের ওই ফাঁস দীর্ঘদেহী সীমন্তিনীর গলায় অনায়াসে পড়িয়ে ঘরের মাঝে ফিরে যায় ঋতি। চেয়ারে উঠে গলায় পড়ে নেয় ফাঁস।

নিজের শেষ নিঃশ্বাসটুকু বন্ধ হয়ে আসার আগে চেয়ার পড়ার শব্দে চেয়ে দেখার চেষ্টা করে সীমন্তিনী। তার অন্ধকার নেমে আসা চোখে পড়ে, ছটফট করতে করতে স্থির হয়ে গেল ঋতির পা দুটোও।


-সমাপ্ত-

মন্তব্যসমূহ