আজকাল সকালটা বড় একলা কাটে নারায়ণের। দাদু থাকতে এই সকাল সকাল তাকে সাইকেলে বসিয়ে নিয়ে যেত ক্ষেতে। তারপর দাদু ক্ষেতে কাজ করত, আর সে বসে বসে পড়ত - ইতিহাস, ভুগোল, অঙ্ক। তাদের গ্রাম সীমানার কাছেই। ওই তো, ওই বড় ঝোপটা পেরোলেই দূরে দেখা যায় সীমানা। কাঁটাতারের বেড়া। ওই বেড়াই আলাদা করে রেখেছে তাদের পবিত্র মাতৃভূমি আর তার ওপারের দেশ। নারায়ণ জানে, ওই কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে আছে শত্রুর রাজ্য। নারায়ণের বাবা মহাদেব বাড়িতে থাকেনা। আসে কখনো কখনো। আবার ফিরে যায়। নারায়ণ জানে, বাবা কোথাও দাঁড়িয়ে আছে এই কাঁটাতারের পাশেই। দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে, যাতে ওপারের শত্রুরা না পারে তাদের দেশের দখল নিতে। নারায়ণ তার দাদুর মুখে শুনেছিল, তারাও একদিন ওই কাঁটাতারের বেড়ার ওপারেই ছিল - না, সে নয়। তার বাবা, তার দাদু,আর তাদেরও বাবা, দাদুরা। ওপার থেকেই তো এসেছিল তার দাদু। এখনো দাদু কখনো কখনো ওপারের গল্প করে। শুনে নারায়ণ ঠিক বুঝতে পারে না, দাদু সত্যিই ওপারের কথাই বলছে, নাকি এ পারের কথাই! সব কিছুই তো একই রকম মনে হয়! নারায়ণ অবশ্য জানে, দাদুরা যখন ওপার থেকে এসেছিল, তখন ওটা শয়তানের দেশ ছিল না। শত্রুর ছিল না। কিন্তু এখন হয়েছে। এখন এপারই ভালো। এপারে থাকে বলেই তো কত কি করে নারায়ণ - স্কুলে যায়, পুকুরে সাঁতার কাটে, গাছে চড়ে, ফল পাড়ে, ক্রিকেট খেলে - আর রোজ সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আসে। তারপর মেহেদি হাসানের গজল শোনে। না না, সে নিজে চালায় না। পারে নাকি এখনই! কিন্তু তার মা চালায়। মা-র বড় প্রিয় যে। তার মা রাধা চালায় মেহেদি হাসানের গান - তার জন্য রুটি আর তরকারি তৈরী করতে করতে শোনে। খাওয়ার পর সেই গান শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে পড়ে নারায়ণ।
বেশ ক'দিন হয়ে গেল নানা চলে গেছে কবরে। তাই দিনের অনেকটা সময় একা একাই কাটে তারিকের। সেই নানার সাইকেল চেপে ক্ষেতে যাওয়া, সেখানে গাছের ছায়ায় বসে পড়া - ইতিহাস, ভুগোল, অঙ্ক - এসব যেন কত জন্ম আগের কথা! আর হয়না সেসব। তাদের গ্রাম সীমানার কাছেই। ওই যে একটা বড় ঝোপ দেখা যায়, ওই ঝোপটা পেরোলেই তারিক দেখতে পায় সীমানা। কাঁটাতারের বেড়া। ওই বেড়াই আলাদা করে রেখেছে তাদের পবিত্র জন্ন্যত আর তার ওপারের জহান্নাম। তারিক জানে, ওই কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে আছে শত্রুর রাজ্য। তারিকের আব্বু ফারুক বাড়িতে থাকেনা। আসে অবশ্য কখনো সখনো। আবার ফিরে যায়। তারিক জানে, আব্বু কোথাও দাঁড়িয়ে আছে এই কাঁটাতারের পাশেই। দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে, যাতে ওপারের শত্রুরা না পারে তাদের জন্ন্যতের দখল নিতে। তারিক তার নানার মুখে শুনেছিল, তারাও একদিন ওই কাঁটাতারের বেড়ার ওপারেই ছিল - না, সে নয়। তার আব্বু, তার চাচা, তার নানা, আর তাদেরও আব্বু, নানারা। ওপার থেকেই তো এসেছিল তার আব্বু। এখনো আব্বু কখনো কখনো ওপারের গল্প করে। শুনে তারিক ঠিক বুঝতে পারত না, নানা সত্যিই ওপারের কথাই বলছে, নাকি এ পারের কথাই! সব কিছুই তো একই রকম মনে হয়! তারিক অবশ্য জানে যে নানারা যখন ওপার থেকে এসেছিল, তখন ওপারটা শয়তানের দেশ ছিল না। শত্রুভূমিও ছিল না। কিন্তু এখন হয়েছে। এখন এপারটা অনেক ভালো। এপারে থাকে বলেই তারিক কত কি করতে পারে - স্কুলে যায়, তালাবে সাঁতার কাটে, গাছে চড়ে, ফল পাড়ে, ক্রিকেট খেলে - আর রোজ সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে আসে। তারপর জগজিৎ সিং-এর গজল শোনে। না না, সে নিজে চালায় না। পারে নাকি এখনই! কিন্তু তার আম্মি চালায়। আম্মির যে বড়ই প্রিয়। তার আম্মি ফারহা চালায় জগজিৎ সিং-এর গান - তার জন্য চাপাটি আর সবজি তৈরী করতে করতে শোনে। খাওয়ার পর সেই গান শুনতে শুনতেই ঘুমিয়ে পড়ে তারিক।
বড় একভাবে দিন কাটে নারায়ণ আর তারিকের। তেমনি একভাবে দিন কাটে মহাদেব আর ফারুকেরও - কাঁটাতারের দুই প্রান্তে দাঁড়িয়ে, মৃত্যুর প্রহর গুনতে গুনতে। কে জানে কখন আসবে মৃত্যু! না, শুধু তাদেরই জন্য যে আসতে পারে মৃত্যু, তা তো নয়। তারা নিজেরাও নিয়ে আসতে পারে অন্য কারো জন্য। মৃত্যুর কারিগর তারা। তাই সীমানার দুই প্রান্তে অস্ত্র উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে মহাদেব আর ফারুক। চোখের পলক পড়ে না তাদের এক মুহূর্তের জন্যও। কি জানি, যদি ওই মুহুর্তে আড়ি পেতে থাকা মৃত্যু ছুটে আসে তাদের নিজেদের জন্য।
কিন্তু কোনো কোনো দিন, যেদিনগুলোতে বিরহী চাঁদটা ঠিক কাঁটাতারের বেড়াটার ওপরের আকাশা এসে দাঁড়িয়ে পড়ে - যেন ঠিক করে উঠতে পারে না, কোন্ পারে বেশী জ্যোৎস্না দেবে, একফালি মেঘ ওই কাঁটাতারের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে পড়ে দুই পারের অতন্দ্র সৈনিকদের বিদ্রুপ করে বলে, "আমাকে তো তোরা পারলি না ভাগ করতে", সেদিন মহাদেবের বারবার মনে পড়ে রাধার কথা। রেডিওতে স্টেশন খুঁজে খুঁজে সে চালিয়ে দেয় মেহেদি হাসানের গজল। রাধার বড় প্রিয় এই গজল। ওই চাঁদকে দেখে বিরহী হয়ে ওঠে ফারুকের মনও। তার হৃদয় তোলপাড় হয় ফারহার কথা ভেবে। রেডিও স্টেশনে খুঁজে খুঁজে সে চালিয়ে দেয় জগজিৎ সিং-এর গজল। ফারহার যে বড় প্রিয় এই গজল।
চাঁদের মায়াবী আলোয় কোথায় যেন মিলিয়ে যায় কাঁটাতারের বেড়া। এক হয়ে যায় নারায়ণ, তারিক, ফারুক, মহাদেব। কি ভাবে যেন মিলে যায় লুকিয়ে লুকিয়ে ফেলা রাধার চোখের জল আর ফারহার আঁখির পানি...।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন